মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে কোনো সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও তুরস্কে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন মিত্র দেশকে কূটনৈতিক চ্যানেলে এই বার্তা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তবে এর প্রতিক্রিয়া শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।
এই হুঁশিয়ারির পেছনে রয়েছে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৬০০ জনে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়, যখন কিছু বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প ইরানের জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখল করার আহ্বান জানিয়ে তাদের প্রতি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেন। তেহরান এই বক্তব্যকে সরাসরি সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবেন না। এই অবস্থান থেকেই তেহরান আঞ্চলিক পর্যায়ে কৌশলগত হুঁশিয়ারি দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন । সৌদি আরব, ইউএই ও তুরস্কে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, কারণ এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ও কৌশলগত অংশীদার।
এদিকে, উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ চলছিল, তা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সংলাপ বন্ধ হয়ে যাওয়া সংকট নিরসনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ইরান আগেও দেখিয়েছে যে, তারা হুমকিকে বাস্তবে রূপ দিতে দ্বিধা করে না। গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। যদিও তখন বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল, তবু সেই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি কতটা বাস্তব, তা স্পষ্ট করে দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব ও ইউএই দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো মিত্র হওয়ায় এই সংকটের ভূরাজনৈতিক মাত্রা আরও গভীর হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ইরান যদি সত্যিই এই দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, তাহলে তা দ্রুতই একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চাপ বাড়াচ্ছে, আর ইরান বলছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এই টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব হবে, নাকি অঞ্চলটি নতুন করে সহিংসতার চক্রে জড়িয়ে পড়বে—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর।
Leave a comment