বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় পৃথিবী শক্তিশালী এল নিনো বা ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) সাম্প্রতিক জলবায়ু পূর্বাভাসে এবারের এল নিনো ‘সুপার এল নিনো’ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রায় ৬৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সংঘটিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এ সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহের ধরন পরিবর্তিত হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, সুপার এল নিনোর ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
এনওএএর জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির প্রবাহ বেড়েছে। এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহের ধরন ইতিমধ্যে পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। উষ্ণ এই পানি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৬০০ থেকে ১ হাজার ফুট নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলসংলগ্ন অঞ্চলে সাগরপৃষ্ঠে উঠে আসছে। অতীতের বড় এল নিনো ঘটনাগুলোর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০১৫–১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্ব আবারও সুপার এল নিনোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে। এর আগে ১৯৯৭–৯৮ ও ১৯৮২–৮৩ সালের সুপার এল নিনো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জলবায়ুগত বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
এল নিনো সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হয়। গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। বর্তমানে উষ্ণতম বছরের রেকর্ড রয়েছে ২০২৪ সালের।
এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, এবারের এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে হারিকেনের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও হাওয়াইয়ে ঘন ঘন হারিকেন আঘাত হানার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে ব্রাজিলে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকায় এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর প্রভাব আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে উঠছে। ফলে সম্ভাব্য সুপার এল নিনো বিশ্বজুড়ে মানবজীবন, কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো কখনোই পুরোপুরি পূর্বনির্ধারিত ধারা অনুসরণ করে না। প্রতিবারই এটি নতুন ধরনের আবহাওয়াগত চমক নিয়ে আসে। ফলে এবারের এল নিনো শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
Leave a comment