ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজা হয় এবং তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে জোহা হলে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আসিফ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
আসিফের অভিযোগ, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তিনি হলের একটি সিটের জন্য প্রভোস্টের কাছে কয়েকবার আবেদন করেন। পরে গণরুমে খালি সিটের বিষয়ে জানতে গেলে তাকে হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ফুয়াদের সঙ্গে কথা বললে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে যুক্ত হলে সিট দেওয়ার কথা বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
আসিফ বলেন, পরে রাতে ফুয়াদের কক্ষে গেলে তাকে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তার মোবাইল ফোন নেওয়া হয়। ফোনের বিভিন্ন তথ্য দেখার পর তাকে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ করা হয়। তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলে পরে কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মী তাকে গণরুমে নিয়ে যান এবং সেখানে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, মারধরের পরও তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাকে মেরে ফেলা বা পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো কথাও বলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আসিফ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তাকে দিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য বলিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তার কাছ থেকে লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আসিফ বলেন, ঘটনায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জোহা হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ। তিনি বলেন, রাকসু নির্বাচন চলাকালে আসিফের সঙ্গে এক-দুবার ফোনে কথা হয়েছিল। পরে হলের সিট নিয়ে সমস্যার কথা জানালে তিনি আসিফকে প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
ফুয়াদের দাবি, আসিফ নিজেই ছাত্রদলে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে তার ফোন হাতে নিয়ে হল ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাফসানের সঙ্গে কথোপকথন দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। ওই কথোপকথনের ভিত্তিতে আসিফের শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে তার সন্দেহ হয়।
ফুয়াদ আরও দাবি করেন, আসিফকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি। বরং একটি ভিডিওতে আসিফ নিজেই মারধরের ঘটনা অস্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, আসিফ ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি হল ছাত্রদলের সভাপতিকে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটানোর নির্দেশ দেন। রাত যতই হোক, শিক্ষার্থীকে হল প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রকৃত ঘটনা জেনে পরে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।
এদিকে, ঘটনার প্রতিবাদে হল প্রভোস্টের পদত্যাগসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে রাবি ছাত্রশিবির। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে দাবিগুলো তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অভিযোগে জড়িত ছাত্রদল নেতাকে হল থেকে বের করা, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ এবং তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এছাড়া শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্তের ঘটনায় হল প্রভোস্টকে অব্যাহতির দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, শিবিরের ট্যাগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানির ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। এ ঘটনায়ও একই ধরনের ট্যাগিংয়ের চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, তারা ছাত্রশিবিরের দাবিগুলো শুনেছেন। প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a comment