বাংলাদেশে চলমান ঘাটতি বাজেটের চাপে সরকার ক্রমেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি এবং ব্যয়ের চাপ মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ধার করতে হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ—কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ—মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও গত বছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়েই সরকার ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক—উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যেমন ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স ও ওভারড্রাফট সুবিধা ব্যবহার করছে সরকার। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে এসব ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা দেখা দিলে সরকার সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার করছে, যার ফলে নতুন টাকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বা ‘মানি ক্রিয়েশন’ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন টাকা তৈরি করে, তখন তা বাজারে ‘হাই পাওয়ার মানি’ হিসেবে প্রবাহিত হয় এবং বহুগুণে অর্থ সরবরাহ বাড়ায়। উৎপাদন ও সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে এই অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায়। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে; এর সঙ্গে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ যুক্ত হলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে টাকা ছাপিয়ে ব্যয় মেটানো কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার মান হ্রাস এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তাই সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যয় দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
Leave a comment