সর্বজিৎ চাকমা, রাঙ্গামাটি
মাদককে সমাজের প্রধান ক্যানসার ও বিভিন্ন অপরাধের অন্যতম মূল কারণ উল্লেখ করে মাদক নির্মূলে সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন রাঙ্গামাটিতে মাদকবিরোধী সমাবেশের বক্তারা। তাঁরা বলেন, সমাজ থেকে মাদক পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সোমবার সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটি জেলা শহরের তবলছড়ি মিনিস্টারিয়াল ক্লাব থেকে মাদকবিরোধী একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ এ র্যালি ও সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত শারমিন, রাঙ্গামাটি সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল একরামুল রাহাত, রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সভাপতি অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ এবং শাহ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এবং সভাপতিত্ব করেন রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব, পিপিএম।
সমাবেশে বক্তারা মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে পরিবার ও সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজের সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান মাদকাসক্ত হলে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি দল-মত-নির্বিশেষে মাদক ব্যবসায়ী ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা আইনি ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান আলোচক ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘সকল অপরাধের মূল কারণ মাদক। তাই মাদককে সমাজ থেকে নির্মূল করতে হবে।’ মাদকবিরোধী অভিযানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডিআইজি বলেন, মাদক ব্যবসার পুরো সরবরাহব্যবস্থা নির্মূল করা হবে। মাদকের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো পুলিশ সদস্য গাফিলতি করলে বা মাদক অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও পারিবারিক নির্যাতনের মতো বিভিন্ন অপরাধের পেছনে মাদকের ভূমিকা রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী, ডিলার ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কোনো আপস করবে না। মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে ইমাম, পুরোহিত, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল একরামুল রাহাত বলেন, কাপ্তাই-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি চালিয়ে দেশি-বিদেশি মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। মাদক সেবনের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঘোষণাও দেন তিনি।
সমাবেশে অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ বলেন, সমাজ থেকে মাদক ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মাদক একটি পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। তিনি স্কুল-কলেজের সামনে ইভ টিজিং রোধ এবং এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য কমিউনিটি পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি সামাজিকভাবে বয়কটের মাধ্যমে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করার পরামর্শ দেন।
সমাবেশ শেষে বক্তারা মাদকমুক্ত ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
Leave a comment