কোরবানির ঈদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজধানীর পশুর হাট ও জাতীয় চিড়িয়াখানাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল অ্যালবিনো জাতের একটি মহিষ। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালন-পালন করা মহিষটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। মাথার চুলের বিশেষ বিন্যাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের সঙ্গে মিল থাকায় খামারিরা মজার ছলে এ নাম দেন। পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ঈদের আগে পুরো মে মাসজুড়ে মহিষটি দেখতে খামারে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও করতে, আবার কেউ কৌতূহলবশত সেখানে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মহিষটি একপর্যায়ে ‘সেলিব্রিটি মহিষে’ পরিণত হয়।
তবে মহিষটিকে ঘিরে যতটা আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার চেয়েও বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে একে ‘অত্যন্ত বিরল’ হিসেবে উপস্থাপন করা নিয়ে। প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অ্যালবিনো বা গোলাপি রঙের মহিষ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারে দীর্ঘদিন ধরেই এমন মহিষ পালন করা হচ্ছে। ফলে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ব্যতিক্রমধর্মী চেহারার হলেও এটি অজানা কোনো প্রাণী নয়।
ঈদের দিন জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মহিষটি। খামার সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক রসিকতা থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছিল। পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের আগে মহিষটি কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটিকে ঘিরে নানা আয়োজন ও আলোচনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত মহিষটি কোরবানি না হয়ে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থান পায়।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নয়, দর্শনার্থীদের আগ্রহের কারণে মহিষটিকে বড় শেডে রাখা হয়েছে।
এদিকে প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, অ্যালবিনো মহিষ বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মহিষে মাত্র একটি এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিতে পারে। সে কারণেই মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মহিষটির জন্য বিশেষ শেড প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও গবেষকের মতে, অ্যালবিনো মহিষকে পুরোপুরি ‘বিরল’ বলা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে সাভার, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়—এ ধরনের মহিষ বহুদিন ধরেই পালন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ আলোচনায় এসেছে মূলত এর চুলের ধরন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এবং গণমাধ্যমের প্রচারের কারণে।
সাভারের আশুলিয়ায় একটি খামারে বর্তমানে অর্ধশতাধিক অ্যালবিনো মহিষ রয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারমালিক। তাঁর ভাষ্য, এসব মহিষ দেখতে মানুষ আগ্রহ দেখালেও বাণিজ্যিকভাবেও এগুলো লাভজনক। অনেকেই কৌতূহল থেকে দেখতে এসে পরে কিনে নিয়ে যান। তাঁর দাবি, গোলাপি মহিষের মাংস তুলনামূলক নরম ও সুস্বাদু।
খামারিরা বলছেন, গরুর তুলনায় মহিষ পালন এখন সহজ ও কম ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি মহিষের মাংসে প্রোটিন বেশি ও চর্বি কম থাকায় শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালবিনো কোনো আলাদা প্রজাতি নয়; এটি একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য। প্রাণীর শরীরে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থের ঘাটতি থাকলে ত্বক, চোখ ও লোমে সাদা বা গোলাপি আভা দেখা যায়। এ কারণেই এসব মহিষের গায়ের রং গোলাপি বা হালকা সাদা হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার মহিষ প্রস্তুত ছিল। যদিও সংখ্যায় তা গরু ও ছাগলের তুলনায় কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহিষের বাজার ও চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রচার ও উপস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশে মহিষ পালন শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে।
Leave a comment