‘এই মার্ডার ফিরোজ গ্রুপ যখনই শুনছে আমার ছেলের বাড়ি পাঠানপাড়া তখনই নির্মমভাবে কোপাইছে। তার মা আর আমি ওখানে যায়া (গিয়ে) রক্ত দুই হাতে নাড়ি (স্পর্শ) আসলাম। আমরা আত্মহত্যা করতে চাচ্ছি কারণ আমরা গরিব মানুষ বিচার পাব না। কার কাছে যাব আমার টাকা পয়সা নেই। বিচার না পাইলে হামরা বাপ-মাও আত্মহত্যা করমো।’
কথাগুলো বলতে বলতে আহাজারি করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব রেজাউল ইসলাম। তিনি রংপুরের বদরগঞ্জে ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাংয়ের হামলায় নিহত নিরীহ ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামের বাবা।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে গত ৫ মে বিকেলে উপজেলার বালুয়াভাটা এলাকার আম্বিয়ার মোড়ে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হামলার শিকার হন ভ্যানচালক আরিফুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে পৌরশহরের পাঠানপাড়া গ্রামে আরিফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় এখনো শোকের ছায়া। বাড়ির উঠানে, যেখানে লাশ গোসল করানো হয়েছিল, সেখানে আগরবাতির ধোঁয়া উড়ছে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ।
বাড়ির ভেতরে আমগাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা রেজাউল ইসলাম। পাশে মাটিতে বসে কান্না করছিলেন আরিফুলের মা।
রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আপনি এই এলাকায় তদন্ত করে দেখেন। আমার ছেলের যদি কোনো খুঁত থাকে, কোনো রিপোর্ট থাকে, যদি কোনো অপরাধী হয়—তাহইলে তখন কন। আমার ছেলে নির্দোষ মানুষ, সে কাম করি খায়। ভ্যান চালায়, মাঝেমধ্যে রাজমিস্ত্রির কাজে যায়। এলাকাবাসীর কাছে জিজ্ঞেস করো, সবাই কইবে ভালো ছেলে আছিল।’
এসময় নিহতের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ব্যাটা তো কোন ঝামেলায় যায় না। কিন্তু তাকে বিনা অপরাধে কেন মারি ফেলাইলো। এখন তার বউ-বাচ্চাটার খোঁজখবর কে নেবে? হামরা এখন কীভাবে বাঁচমো?’
এদিকে নিহতের স্ত্রী শারমিন স্বামী হারানোর শোকে ঘরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। তিনি ঠিকমতো পানি পর্যন্ত মুখে নিচ্ছেন না। শোকে পাথর হয়ে আছেন তিনি।
কান্নাভেজা কণ্ঠে শারমিন বলেন, ‘আমার বাপ-মা কেউ নেই। স্বামী ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কেউ ছিল না। কিন্তু তাকেও কাড়ি নেওয়া হইলো। আমাদের সন্তানটা এতিম হয়ে গেল। আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রংপুর আদালতে মামলার হাজিরা দিতে যান কুখ্যাত ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাং ও পাঠানপাড়া এলাকার মমিনুল গ্রুপের সদস্যরা। সেখানেই দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সেখানে ফিরোজ শাহ ওরফে ‘মার্ডার ফিরোজ’ এর নেতৃত্বে মমিনুল গ্রুপের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে মমিনুলসহ কয়েকজন আহত হন। পরে বিষয়টি আপাতত মীমাংসা করা হয়।
আদালত থেকে ফেরার পর বিকেলে বদরগঞ্জে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিশোধ নিতে মমিনুলের অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ফিরোজ বাহিনীকে খুঁজতে থাকে। একই সময় ফিরোজ গ্রুপও মমিনুল পক্ষকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে আম্বিয়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানচালক আরিফুলের কাছে তার বাড়ি কোথায় জানতে চাওয়া হয়। তিনি পাঠানপাড়া গ্রামের কথা বলতেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা রেজাউল ইসলাম বাদী হয়ে বদরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাংয়ের প্রধান ফিরোজ শাহকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী লাবিব ও পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব গোপাল ব্যানার্জিসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অজ্ঞাতনামাকেও আসামি করা হয়েছে।
এদিকে এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি জামাল বাদশা, সোহাগ বাবু ও সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতেই তাদের আটক করা হয়।
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার কালবেলাকে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা চিহ্নিত অপরাধী। ঘটনার পর তারা গা ঢাকা দিয়েছে। তবে পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাদেরকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে। জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কেউ ছাড় পাবে না।’
Leave a comment