Home জাতীয় অপরাধ ফারহানার মৃত্যুর এক মাস পরও দুর্ঘটনার কারণ জানায়নি তদন্ত
অপরাধ

ফারহানার মৃত্যুর এক মাস পরও দুর্ঘটনার কারণ জানায়নি তদন্ত

Share
Share

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়ে প্রকৌশলী ফারহানা হকের মৃত্যুর এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার কারণ উদ্‌ঘাটিত হয়নি। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৯৮৮ ব্যাচের প্রকৌশলীরা। তাঁদের অভিযোগ, বারবার যোগাযোগের পরও তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পায়নি পরিবার। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গতকাল রোববার রাজধানীর বনানীতে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট ক্লাবে বুয়েট ব্যাচ-৮৮ স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। এতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, পিপিই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফারহানা হক আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে স্ট্রাকচার বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। গত ৬ আগস্ট তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ কক্সবাজার অবকাঠামো ইউনিটে সিনিয়র ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন তিনি।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার ১৮ দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এ আইওএমের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন ফারহানা। পরে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি দুই বছরের এক ছেলে সন্তান রেখে গেছেন।

ফারহানার স্বামী শোয়াইব মো. শীছ বলেন, দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্তের ফল তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এ বিষয়ে গত ৩ ও ১২ সেপ্টেম্বর আইওএমের কাছে ই-মেইল করে ঘটনার প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তাব্যবস্থার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারকে দেওয়া আইওএমের ১৭ সেপ্টেম্বরের জবাবের বরাত দিয়ে বলা হয়, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের কাজ স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রাপ্য সিসিটিভি ফুটেজ ও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে ফুটেজে দুর্ঘটনার মুহূর্ত ধরা পড়েনি। অন্যদিকে ফারহানার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা ও তদন্ত চলছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হয়নি।

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুর্ঘটনার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা। তাঁদের মতে, দুর্ঘটনার মুহূর্তের ফুটেজ না থাকলেও ঘটনাস্থলের অবস্থা, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনা করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা সম্ভব।

বুয়েট-৮৮-এর রাসায়নিক ও পেশাগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি কর্মীর মৌলিক অধিকার এবং নিয়োগকর্তার আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি নিরাপত্তার ‘শেষ রক্ষাকবচ’। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রথমেই দেখতে হবে, চলমান জেনারেটরের ঘূর্ণায়মান অংশ যথাযথভাবে ঘেরা ছিল কি না এবং সংস্কারকাজের এলাকা নিরাপদভাবে আলাদা করা হয়েছিল কি না।

তাঁর মতে, তদন্তে ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি, প্রয়োজনীয় পিপিই সরবরাহ, কাজের যথাযথ তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি না, এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী দুর্ঘটনার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

ফারহানার বাবা প্রকৌশলী এ কে ফজলুল হক বলেন, ‘আমার মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য আমি বাবা হিসেবে জানতে চাই। একটি কাজের সাইটে নিরাপত্তার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত না থাকলে কেউ কাজে যায় না। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না, সেটি জানতে চাই।’

বুয়েট-৮৮-এর সভাপতি মো. হাসিবুর রশিদের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে প্রকৌশলী ফাহীমা সাহাদাত বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের চলাচল থাকলে সংস্কারকাজ ও চলমান যন্ত্রপাতি থেকে তাঁদের এবং কর্মীদের নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। কাজের এলাকা যথাযথভাবে বেষ্টনী দিয়ে আলাদা করা হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রকৌশলীদের মতে, তদন্ত শুধু দুর্ঘটনার মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছিল কি না, কাজের নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সাইটে তদারকির দায়িত্ব কার ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল কি না—পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে আইওএম বাংলাদেশ ও এনরুট ইন্টারন্যাশনালকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে ফারহানার পরিবারকে পূর্ণাঙ্গ লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে নির্মাণ ও সংস্কারকাজে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

আজ সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেবে সিআইডি

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ মঙ্গলবার দিন নির্ধারিত রয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)...

জার্মানিতে সাড়ে ৬ লাখ পদে চাকরি, বাংলাদেশীদের জন্য বড় সুযোগ

দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য জার্মানিতে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার পদ খালি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে থেকে চাকরির জন্য যেতে আগ্রহী দক্ষ কর্মীদের...

Related Articles

মাদরাসার নামে ভুয়া রশিদ বই ছাপিয়ে টাকা আদায়, হাতেনাতে আটক ৩

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে অভিনব কায়দায় অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর...

সাউথইস্ট ব্যাংকের ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় বিএনপি নেতা কারাগারে

সাউথইস্ট ব্যাংকের ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির...

রাড্ডাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ৪০ জনের তালিকা গোয়েন্দাদের হাতে

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর, লুটপাট ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি...

সহকর্মীকে ছুরি মারা সেই ওমানি পাইলট সম্পর্কে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরাইলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত...

;