পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক কল্যাণ নীতি ও প্রশাসনিক পরিচালনায় এক ঐতিহাসিক ও বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিল নবগঠিত রাজ্য প্রশাসন। সোমবার (১৮ মে) মন্ত্রিসভার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর জানানো হয়, রাজ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এতদিন যেসব সরকারি সহায়তামূলক প্রকল্প বা অনুদান চালু ছিল, সেগুলি ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে চালু হওয়া ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং সনাতন ধর্মের পুরোহিতদের মাসিক ভাতা প্রকল্পটি বন্ধের মুখে পড়ল।
রাজ্যের নবনিযুক্ত নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নবান্নে সাংবাদিকদের সামনে এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, চলতি মাস (মে) পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির আওতায় থাকা সুবিধাভোগীরা তাঁদের নিয়মিত সুবিধা পাবেন। তবে আগামী মাস (জুন) থেকে এই ধরনের কোনো প্রকল্প আর কার্যকর থাকবে না। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীনে ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসকে ভিত্তি করে যেসব বিশেষ অনুদান, আর্থিক প্রণোদনা বা মাসিক সহায়তা দেওয়া হতো, সেগুলির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এই বিষয়ে খুব শিগগিরই নবান্ন থেকে একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা ও রূপরেখা প্রকাশ করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় জয়ের পর বিজেপি সরকার গঠনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত সামনে আসায় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের আগে গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার ও তোষণমুক্ত সুশাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই পদক্ষেপকে তারই প্রথম বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, যদিও এই পুরো ব্যবস্থার রূপান্তরটি বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর আইনি প্রক্রিয়ার অধীনেই নেওয়া হয়েছে, তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইতিপূর্বে এই সামাজিক সুবিধার আওতায় রাজ্যের হাজার হাজার ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে এবং পরবর্তীতে পুরোহিতদের জন্য প্রতি মাসে সরকারি তহবিল থেকে ভাতা দেওয়া হতো। শুরুতে এই ভাতার পরিমাণ ১৫০০ টাকা থাকলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে মাসিক ২০0০ টাকা করা হয়েছিল। নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তে সেই কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে এই বিষয়টি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ এক দশক ধরে তীব্র বিতর্ক চলেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের প্রকল্পকে ‘পক্ষপাতমূলক ও ভোটব্যাংকের রাজনীতি’ বলে তীব্র অভিযোগ তুলে আসছিলেন। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে একে প্রায়শই ‘রেউরি সংস্কৃতি’ বা সস্তা জনমোহিনী নীতি বলে সমালোচনা করা হতো—যেখানে কেবল রাজনৈতিক লাভের জন্য সরকারি কোষাগারের টাকা নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর পেছনে ব্যয় করা হয়। সেই নীতিগত অবস্থান থেকেই ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার ধর্মভিত্তিক আর্থিক সুবিধা বন্ধের পথে হাঁটল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন নাগরিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক সমতার একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার লক্ষ্যেই এই বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
Leave a comment