ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী জমিদারবাড়ি প্রায় আড়াই শ বছরের পুরোনো। একসময় জাঁকজমক ও ঐশ্বর্যের প্রতীক এই জমিদারবাড়ি এখন অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল, ধসে পড়ছে দেয়াল। চারপাশে গড়ে উঠেছে ঝোপঝাড়। পরিত্যক্ত ভবনের ভেতর এখন শেয়াল-কুকুরের বিচরণ।
আঠারবাড়ী জমিদারবাড়িটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত হোসেনশাহী পরগনা রাজশাহী কালেক্টরের অধীনে ছিল। ১৮২২ সালে নিলামে চারজন ব্যক্তি এই জমিদারি কিনে নেন। তাঁদের মধ্যে বিবি এজিনার অংশটি কিনেছিলেন আঠারবাড়ীর জমিদার শম্ভুরায় চৌধুরী। পরে অন্য অংশীদারদের জমিদারিও কিনে নেন তাঁর ছেলে মহিম চন্দ্র রায়।
মহিম চন্দ্র রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারবাড়ী মহিম চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় (এমসি উচ্চবিদ্যালয়)। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, শম্ভুরায় চৌধুরীর বাবা দীপরায় চৌধুরী যশোর জেলার একটি পরগনার জমিদার ছিলেন। পরে তিনি ছেলে শম্ভুরায়কে নিয়ে আঠারবাড়ীতে চলে আসেন এবং তাঁর নামে জমিদারি কিনে দেন।
আগে এই এলাকার নাম ছিল শিবগঞ্জ বা গোবিন্দবাজার। পরে জমিদারি পরিচালনার জন্য দীপরায় চৌধুরী যশোর থেকে ১৮টি হিন্দু পরিবারকে এখানে নিয়ে আসেন। তাঁদের বসবাসের জন্য নির্মাণ করা হয় বাড়িঘর। ১৮টি পরিবারের বসবাসের কারণে এলাকাটির নাম আঠারবাড়ী হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে।
এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। তৎকালীন জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আঠারবাড়ী জমিদারবাড়িতে এসেছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
জমিদারবাড়িকে ঘিরে একসময় ছিল সবুজে ঘেরা পরিবেশ। ছিল অন্দরমহল, টিনের গম্বুজ, সারি সারি গাছ ও রানীর পুকুর। সময়ের সঙ্গে এসবের অনেক কিছুই বিলীন হয়েছে। বর্তমানে জমিদারবাড়ির বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে শ্যাওলা জমেছে। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও পরিচর্যা না হওয়ায় ভবনের কিছু অংশ ধসে পড়ছে। চারপাশে জন্মেছে বড় বড় ঝোপঝাড়। ভবনের ভেতরে ও আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে শেয়াল ও কুকুর।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জমিদারবাড়িটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত পরিচর্যা ও সংস্কার না হওয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এর সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যেতে পারে।
Leave a comment