দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার বিনতি (৮)। দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে সে। এবার তার তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলও করেছিল—রোল নম্বর ২২ থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল আয়েশা। কিন্তু সেই সাফল্য আর নিজের চোখে দেখা হলো না তার। যে খবরে বাবা–মা, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মুখে হাসি ফুটে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু হাহাকার আর চোখের জল।
তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে রোল কলের সময় আয়েশাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। রোল দুই ডাকার সঙ্গে সঙ্গে আয়েশা আর বলে উঠবে না প্রেজেন্ট স্যার। আয়েশার বেঞ্চটি থাকবে শূন্য।
আয়েশা ছিল বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তার বড় মেয়ে সালমা আক্তার স্মৃতিও (১৮)একই অগ্নিকাণ্ডে শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে মারা যান। বেলাল হোসেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং স্থানীয় সূতারগোপ্তা এলাকার একজন সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা বেলাল হোসেনের বসতঘরের বাইরে থেকে দুটি দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই সময় ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল ছোট্ট আয়েশা। আগুনের লেলিহান শিখায় সেখানেই মৃত্যু হয় তার।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পাকা ভিটির ওপর নির্মিত টিনশেড ঘরের তিনটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন বেলাল হোসেন, তার স্ত্রী নাজমা বেগম, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। আগুন লাগার পর বেলাল হোসেন কোনোভাবে টিনের বেড়া উঁচু করে স্ত্রী, চার বছর বয়সী ছেলে নাজমুল ইসলাম, চার মাস বয়সী শিশু নজরুল ইসলাম, বড় মেয়ে স্মৃতি এবং মেজো মেয়ে সামিয়া আক্তারকে বের করে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, আয়েশার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরিবারের সবার চোখের সামনেই আগুনে পুড়ে মারা যায় আদরের কন্যা।
ওই ঘটনায় বড় মেয়ে সালমার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়। তাকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়। মেজো মেয়ে সামিয়ার শরীরের প্রায় ২ শতাংশ দগ্ধ হলেও প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর মুঠোফোনে বিদেশে থাকা এক প্রবাসীর সঙ্গে সালমার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার আগেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে তার শ্বাসনালিসহ শরীরের এমন কোনো অংশ ছিল না, যা দগ্ধ হয়নি।
রোববার রাতে আয়েশার বাবা বেলাল হোসেন বলেন, “আমার মেয়েটা তো আর নেই। যখন শিক্ষক ফোন করে বললেন আয়েশা দ্বিতীয় হয়েছে, তখন বুকফাটা কান্না ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এই ফলাফল দিয়ে এখন আমি কী করব? এক আগুনে আমার দুই সন্তানকে হারালাম।”
স্থানীয় ফাইভ স্টার স্কুলের প্রধান শিক্ষক নোমান সিদ্দিকী বলেন, “আয়েশা খুব মেধাবী ছাত্রী ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রোল ২২ হলেও সে মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। তৃতীয় শ্রেণিতে তার রোল হয়েছে ২। কিন্তু সে আর নেই—এই সত্যটাই সবচেয়ে কষ্টের।”
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ জানান,
“ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। মামলার তদন্ত চলছে। এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে জড়িতদের শনাক্তে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।”
Leave a comment