উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিবছর সিলেট থেকে হাজারো মানুষ পাড়ি জমান ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু কাজের সন্ধানে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। ফলে দিন দিন বিদেশের মাটিতে সিলেটি প্রবাসীদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন দেশে পৃথক দুর্ঘটনায় সিলেটের অন্তত নয়জন প্রবাসী যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের পরিবারের সদস্যদের।
গত ২১ জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসী নিহত হন। কাজে যাওয়ার পথে তাদের বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান।
নিহতরা হলেন—কানাইঘাট উপজেলার ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ, একই গ্রামের মৃত মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ী গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ।
গত ৩০ জুন তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করতে এসে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে চার বছর আগে কাতারে গিয়েছিলেন কাদির আহমদ। আগামী মাসে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু জীবিত নয়, দেশে ফিরেছে তার মরদেহ।
অন্যদিকে, মাত্র দুই মাস আগে ছুটি কাটিয়ে কাতারে ফিরে গিয়েছিলেন জুবায়ের আহমদ। প্রায় এক যুগ আগে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তার বাবা মড়া মিয়া। বাবার মতো একই পরিণতি হয়েছে তারও।
জুবায়ের আহমদের ভগ্নিপতি নাজমুল ইসলাম বলেন, পরিবারটি আগেই অসচ্ছল ছিল। ঋণ নিয়ে জুবায়ের বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। বিদেশে গিয়ে সেই ঋণ শোধ করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু এখন ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম সদস্যও নেই।
নিহত জিবাল উদ্দিনের ছেলে পারভেজ আহমদ জানায়, তারা পাঁচ ভাইবোন। সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র সাত মাস। তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন তার বাবা। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
এদিকে, গত ৪ জুলাই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আলাইয়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় মারা যান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়নের পাড়ুয়া গ্রামের মাসুক মিয়ার ছেলে জয় আহমদ এবং খাগাইল গ্রামের আবদুল হাফিজের ছেলে মোতাহার হোসাইন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নির্মাণাধীন ভবনের ওপর কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তারা লিফটের ফাঁকা অংশ দিয়ে নিচে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শওকত আলী বাবুল বলেন, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একই দিন পর্তুগালের সেতুবাল জেলার আলমেদা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের মুতলিব আলীর ছেলে শামসুল ইসলাম কামরান। তিন মাস আগে বিয়ে করে তিনি পর্তুগালে ফিরে গিয়েছিলেন।
এর আগে, গত ২ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কানাইঘাট উপজেলার মুক্তাপুর গ্রামের ফয়েজ আহমদের ছেলে তারেক আহমদ।
প্রবাসীকল্যাণ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে দাফনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩৫ হাজার টাকা এবং পরে নিহতের পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
স্বজনেরা বলছেন, সরকারি এই সহায়তা দ্রুত পেলে অন্তত আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলোর কিছুটা উপকার হবে।
Leave a comment