ভারতে তরুণদের টানা আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার। মোদি সরকারের জন্য গত কয়েক বছরে এটিকে অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজিপি)–এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে দ্রুত দেশের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং মোদি সরকারের কথিত ‘স্বৈরাচারী শাসনের’ বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রধান দাবিগুলোর কয়েকটি পূরণ হওয়ার পর আপাতত রাজপথের বিক্ষোভ স্থগিত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকা এবং মোদি সরকারের জন্য ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
চাপে মোদি সরকার
গত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে নরেন্দ্র মোদির জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক দশক ধরে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতা হিসেবে মোদির যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, এই পদত্যাগ তা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং তরুণদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান রেখে পার্লামেন্টে একটি বিল পাস করেছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা কয়েকটি মামলার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মোদির সক্রিয়তা বেড়েছে। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে তিনি নতুন ধরনের ভিডিও প্রকাশ করছেন।
নজরদারি ও ইন্টারনেট বন্ধ
আন্দোলন দমনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–চালিত ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কয়েকজন নারী বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁরা অনলাইনে ধারাবাহিক হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র নয়াদিল্লিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে বিক্ষোভকারীদের প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে নতুন উপায়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে।
পরীক্ষার বাইরেও ক্ষোভ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল তরুণদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপলক্ষ মাত্র। পড়াশোনা শেষ করার পরও বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
তাই শুধু পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনলেই তরুণদের মধ্যে জমে থাকা অর্থনৈতিক অসন্তোষ দূর করা কঠিন হবে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির মতো বড় বিষয়গুলোও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
‘ককরোচ’ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজিপির লাখো অনুসারী থাকলেও এই জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সংগঠনটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সিজিপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, তাঁরা এখনই রাজনৈতিক দল গঠন করতে চান না। বরং একটি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করবেন তাঁরা। তরুণদের মতামত ও দাবিগুলো জানতে দেশজুড়ে সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ তরুণ ভোটার
ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের এখনও প্রায় তিন বছর বাকি থাকলেও তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব এখন থেকেই বাড়ছে।
তরুণদের ভোট ও তাঁদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে প্রধানমন্ত্রী মোদির দল ও বিরোধী দল—উভয়কেই কৌশল ঠিক করতে হবে। ফলে রাজপথের বিক্ষোভ আপাতত থেমে গেলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব ভারতের রাজনীতিতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।
Leave a comment