দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বর্তমানে এসব ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। বাকি চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তবে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ জুলাই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৯২৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু ২২ জুলাই এলএনজি সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৬২১ মিলিয়ন ঘনফুটে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও কিছুটা কমে ৯০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
এদিকে গত এক বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক বছর আগে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ১ হাজার ৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা কমে ৯০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও এক বছরে ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও একই সময়ে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে।
জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এলএনজি আমদানি অবকাঠামোর কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা সংকটে পড়ে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আবাসিক খাতে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মৌচাক ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। অনেক এলাকায় গভীর রাতের আগে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাসের ঘাটতিতে বিপাকে পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহনও। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি কয়েকটি স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ নোটিশও দেখা গেছে। চালকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
এদিকে কমিশন বৃদ্ধি, স্বয়ংক্রিয় কমিশন সমন্বয় ব্যবস্থা চালু, অতিরিক্ত জামানত নেওয়ার প্রথা বাতিল এবং বিভিন্ন লাইসেন্স ও নবায়ন ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি আগামী ৩০ জুলাই প্রতীকী ধর্মঘট এবং দাবি পূরণ না হলে ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, কারিগরি সমস্যার কারণে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন এবং সীমিত সরবরাহের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
Leave a comment