ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় মিত্ররা এখন ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব দেশের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এমন অবস্থান ঘোষণা করেনি।
ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে পরিস্থিতি ক্রমশ ওয়াশিংটনের অনুকূলে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, “আমাদের কৌশলগত সুবিধা বাড়ছে এবং উপসাগরীয় মিত্ররা আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা এখন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে।”
কিন্তু এই মন্তব্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, হেগসেথের মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
একই সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ আরেকটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অনুমতি ছাড়া চলাচলের চেষ্টা করলে হামলার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ইরান দাবি করছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব স্থাপনাকে লক্ষ্য করে তারা প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘাঁটি থেকে তাদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলেই পাল্টা আক্রমণ বন্ধ করা সম্ভব।
যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। তাদের আশঙ্কা ছিল, সংঘাত শুরু হলে তারাই ইরানের প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
এ আশঙ্কা ইতোমধ্যে বাস্তবে পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান কাতারের রাজধানী দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং বাহরাইনের রাজধানী মানামার আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও তীব্র হলে এসব হামলার মাত্রা বাড়তে পারে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত একটি প্রস্তাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়। তবে ওই প্রস্তাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি।
ভোটের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এখন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে ইরানের ওপর হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা হওয়ার পর তারা তেহরানের প্রতি আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা না করায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও কিছুটা অসন্তুষ্ট।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও উন্নত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর চেয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন সেই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
এদিকে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এসব ঘাঁটি একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
হামলার আশঙ্কায় কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব তাদের জ্বালানি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১৬টি তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে।
পণ্য বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি খাতে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ ইরান আগেই সতর্ক করে দিয়েছে—যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে সমর্থন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক ধরনের কৌশলগত দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ালে নিজেদের ভূখণ্ড আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আরও অস্থির হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধান না হলে উপসাগরীয় অঞ্চল আগামী মাসগুলোতে আরও বড় নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
Leave a comment