Home আন্তর্জাতিক ইরানে হামলা—ট্রাম্পের পরিকল্পনা কি ব্যর্থ হচ্ছে?
আন্তর্জাতিক

ইরানে হামলা—ট্রাম্পের পরিকল্পনা কি ব্যর্থ হচ্ছে?

Share
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
Share

আল–জাজিরা | গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর দিন ফ্লোরিডায় নিজের রিসোর্ট মার–এ–লাগোতে বসে তা দেখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনীর অভিযানের দুই দশকের বেশি সময় পর এবার ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে ওয়াশিংটন।

যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় ট্রাম্পের বক্তব্য বারবার বদলাতে দেখা যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর বক্তব্যগুলো অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত লক্ষ্য আসলে কী।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তেহরানে হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার, পানি শোধনকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে।

জবাবে ইসরায়েল ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান এবং হাজার হাজার ড্রোন পাঠিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো, মার্কিন দূতাবাস এবং বেসামরিক স্থাপনাগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তু।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ২০০–এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬০টির বেশি শিশু নিহত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অপরদিকে সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আসলে কীভাবে এ যুদ্ধ শেষ করতে চান—তা তাঁর বক্তব্য বা প্রশাসনের অবস্থান থেকে স্পষ্ট নয়।

হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রায় ৩৭ বছর ধরে ইরানের নেতৃত্বে ছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে ‘শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন’ চাওয়ার কথা বলেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতাকাঠামো দুর্বল করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

পাকিস্তান–চায়না ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা হায়দার সায়েদ বলেন, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দেশটিতে গণবিদ্রোহ সৃষ্টি করা।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ছিল ইরানের নেতৃত্বের বড় অংশকে সরিয়ে দিলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধসে পড়বে।

তবে বাস্তবে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের ভাঙনের প্রমাণ এখনো দেখা যায়নি।

এর মধ্যে ইরান আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করেছে।

সায়েদের মতে, এখানেই ট্রাম্পের বড় ভুল ছিল। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন হয়তো ধারণা করেনি যে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা রাখে।’

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প কখনো সমঝোতার কথা বলেছেন, আবার কখনো ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।

প্রথমদিকে তিনি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সদস্যদের অস্ত্র নামিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। এর বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

পরে তিনি ইরানি কূটনীতিকদেরও পক্ষ পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

কিন্তু আইআরজিসি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানি কূটনীতিকেরা প্রকাশ্য চিঠিতে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।

ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা বলেছেন, অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তারা এখন ইরানের আকাশসীমার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল পাওয়া কঠিন।

অভিযান শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারাই নিজেদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবেন।’

পরে তিনি বলেন, যুদ্ধের পর ইরানের সরকার দেশটির ভেতরের কারও হাতেই থাকা উচিত।

এতে সাবেক শাহর ছেলে রেজা পাহলভির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কমে যায়। তিনি বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

অন্যদিকে ট্রাম্প আবার বলেছেন, তিনি মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে স্বীকার করেন না।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়নবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রিয়াস ক্রিগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করা।

তিনি বলেন, ‘স্থলযুদ্ধ শুরু করা বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতা চুক্তির পথেই যেতে পারেন, যাতে তিনি দাবি করতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহবুব জোয়েইরি বলেন, ইসরায়েল বর্তমান সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে।

 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ উদ্বোধন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও গ্যাস সংকট নিরসনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নব্য...

ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সৌদির ২৬ বিমান হামলা, চরম উত্তেজনা

ইয়েমেনে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হুথি নিয়ন্ত্রিত একাধিক কৌশলগত এলাকায় সৌদি জোট অন্তত ২৬টি বিমান...

Related Articles

ব্রিটিশদের পাসপোর্ট নিয়ে ৯৯ দিনের সতর্কতা

  বড়দিনের ছুটিতে বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ব্রিটিশ নাগরিকদের এখনই পাসপোর্ট যাচাই...

ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র, তথ্য ফাঁসে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪ হাজার ৩৬০ কোটি...

হরমুজ প্রণালিতে দুই ট্যাংকারে হামলার খবর, ‘বড় সিদ্ধান্তের’ ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি...

মসজিদে হারামের বর্তমান ১০ ইমাম, জানুন তাঁদের পরিচয়

পবিত্র মসজিদে হারাম বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও...