Home আন্তর্জাতিক ইরানে বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা: মৃত্যুদণ্ডের হুমকি
আন্তর্জাতিক

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা: মৃত্যুদণ্ডের হুমকি

Share
Share

ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা গণবিক্ষোভের মধ্যে দেশটির সরকার এবার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ আন্দোলনকারীদের ‘মোহারেব’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অভিযোগ আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে ।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে বা যেকোনোভাবে বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করছে, তাদের সবাইকে ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইরানের আইন অনুযায়ী, এই অভিযোগের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সরকারের এই অবস্থান বিক্ষোভকারীদের জন্য সরাসরি জীবন-মরণের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলমান দমনপীড়নে ইতোমধ্যে অন্তত ১১৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিহতদের বড় একটি অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। যদিও সরকারিভাবে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।

ইরানের দণ্ডবিধিতে ‘মোহারেব’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। অনুচ্ছেদ ১৮৬ অনুযায়ী, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতায় জড়িত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এই তকমা দেওয়া যায়। শুধু সরাসরি অস্ত্রধারী ব্যক্তিরাই নয়, জেনে-শুনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারীরাও এই আইনের আওতায় পড়তে পারেন।

আরও কঠোর হলো অনুচ্ছেদ ১৯০, যেখানে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসি, ডান হাত ও বাম পা কেটে ফেলা কিংবা স্থায়ী নির্বাসনের মতো চরম দণ্ডের বিধান রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার এই আইন প্রয়োগের হুমকি দিয়ে আন্দোলন দমাতে চাইছে, যা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে রাজনৈতিক বিরোধ দমনের একটি বিপজ্জনক নজির।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের প্রতি সংযম দেখানোর আহ্বান জানালেও তেহরান তাতে কর্ণপাত করছে না। বরং রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ ও দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে “দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা” নিতে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ২,৬০০ জনকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাপকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক এলাকায় ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে, তা ভয়াবহ। একাধিক বিক্ষোভকারী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনকে জানিয়েছেন, তেহরানের রাস্তায় বিপুল জনসমাগমের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। একজন নারী জানান, তিনি একটি হাসপাতালের ভেতরে একে অপরের ওপর স্তূপ করা লাশ দেখেছেন—যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি প্রাণহানির ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের একটি দল জানায়, তারা ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন, যিনি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মারাত্মকভাবে আহত হন। তার একটি হাত ভেঙে যায় এবং পায়ে প্রায় ৪০টি পেলেট বিদ্ধ ছিল। এই ধরনের আঘাত ইঙ্গিত করে যে, দাঙ্গা দমনের অস্ত্র ও গুলির ব্যাপক ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই সহিংসতা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। জাতীয় মুদ্রার মারাত্মক অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানো সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এই পটভূমিতে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় বর্তমান গণআন্দোলন। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তা ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

দিন যত গড়িয়েছে, আন্দোলনের তীব্রতাও তত বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচিতে দোকানপাট, পরিবহন ও সরকারি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক শহরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে ইরান সরকার সংকটকে আরও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে আন্দোলন দমন করা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে জনরোষ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে পারে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

সরকার চাইলে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারে : সংসদে রুমিন ফারহানা

বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, বর্তমান...

‘রসুনের তেল’ দিয়ে ক্যানসার নিরাময়ের দাবি, সেই অভিযুক্ত চিকিৎসকের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল

চিকিৎসা পেশার নৈতিকতা ও মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের ঠকানোর অভিযোগে  চিকিৎসক মোহসেন আলীর লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়...

Related Articles

ছয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন আরাগচি

আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সামরিক আগ্রাসন বন্ধে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরতে...

পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল ইরান

স্থবির হয়ে পড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা আবার সচল করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে...

এটি তাদের খুব কাছেই রয়েছে ;নতুন অস্ত্রের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন এক অস্ত্র...

ইরানের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক তাণ্ডব শুরু করেছে ওয়াশিংটন। এই...