ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক মাস ধরে থেমে থেমে চলা সংঘাতের পর ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গেলে যেসব দেশ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, তাদের মধ্যে রয়েছে চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), তুরস্ক, রাশিয়া, ইরাক, জার্মানি, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও জাপান।
ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি চীনের সঙ্গে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান চীন থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। একই সময়ে চীনে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে দেশটি।
ইরান থেকে চীনে রপ্তানির বড় অংশ ছিল হাইড্রোকার্বন এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অ্যালকোহল ও প্লাস্টিকজাত রাসায়নিক পণ্য। বিপরীতে চীন থেকে শিল্পযন্ত্র, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, গাড়ি ও ধাতু আমদানি করে ইরান।
ইউএই ও তুরস্ক
চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।
ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে ইউএই থেকে। এর মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার।
ইরানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারির আগের ১০ মাসে ইরান থেকে ইউএইতে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে ইউএই থেকে ইরানে আমদানি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
ইরানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার তুরস্ক। ইরানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে তুরস্ক থেকে ইরান ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে ইরান থেকে তুরস্কে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এর মধ্যে হাইড্রোকার্বনজাত পণ্যই ছিল প্রধান।
রাশিয়া ও ইরাক
২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে রাশিয়া থেকে ইরানের আমদানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইরান থেকে রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ৯৩০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া শস্য, সোনা ও কাঠের বিনিময়ে ইরানের কৃষিপণ্য নিয়েছিল। কাস্পিয়ান সাগরে দুই দেশের বাণিজ্যের জন্য নতুন নৌপথ চালুর কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষ ১০ মাসে ইরান থেকে ইরাকে ৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে ইরাক থেকে ইরানে আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমেছে
ভারতের বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের পর জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে ভারত। সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ভারত ইরান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার অন্য দেশগুলো
জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান দপ্তর ডেস্টাটিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইরানে জার্মানির রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৭০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে জার্মানি ইরান থেকে ২১৭ মিলিয়ন ইউরোর পণ্য আমদানি করেছে।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি বেড়ে ৬৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। আগের বছর তা ছিল ৪৩ মিলিয়ন ডলার। তবে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সরকারি হিসাবে দুই দেশের তেলবাণিজ্য প্রায় বন্ধ রয়েছে।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে জাপানের রপ্তানি ৩৮ শতাংশ বেড়ে ৮৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ২৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। জাপানের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল ওষুধ, গাড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। ইরান থেকে জাপানের আমদানির মধ্যে ছিল কাপড়জাত পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী।
২০২৪ সালে ফিলিপাইন ইরানে ৬৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের ৩৮ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। একই সময়ে ইরান থেকে ফিলিপাইনের আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার ডলারেরও কম।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর তালিকা ও বাণিজ্যের পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে চীন, ইউএই, তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর। তবে দেশগুলো কীভাবে ট্রাম্পের হুমকির প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Leave a comment