আবু হানিফ, সিরাজগঞ্জ
একসময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল সিরাজগঞ্জের ঐতিহাসিক সলঙ্গা হাট। মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে সংঘটিত সলঙ্গা আন্দোলনে প্রায় চার হাজার মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এই হাট এখন অব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, যানজট ও বর্জ্য সমস্যায় জর্জরিত। সপ্তাহে দুই দিন বসা এই ঐতিহ্যবাহী হাটে ক্রেতা, বিক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের চিত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার হাট বসার দিন স্লুইস গেট, মাদ্রাসা মোড়, নতুন ব্রিজ ও থানা মোড় এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে শুধু ক্রেতা-বিক্রেতাই নন, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় স্বাভাবিক যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই হাটের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ডিমহাটসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে। কোথাও কাদা, কোথাও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি। এতে স্বাভাবিক বেচাকেনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।
হাটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নাজুক। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন না থাকায় বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য স্লুইস গেটের নিচ দিয়ে নদীতে ফেলা হচ্ছে। আবার কিছু বর্জ্য হাটের পশ্চিম পাশে একটি পরিত্যক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে। মাছের বাজারের পচা পানি ও মুরগির বিষ্ঠার দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
গরুর হাটেও একই চিত্র। হাঁটুসমান কাদা ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই ধানহাট এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ডিমহাট থেকে গুড়হাটা পর্যন্ত সড়কে কাদা ও পানি জমে চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। মাংসহাট, জুতাহাট ও তরকারি হাটসহ বাজারের বিভিন্ন অংশ কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে।
কাঁচামাল ব্যবসায়ী আবু হানিফ বলেন, ‘তরকারি হাটের রাস্তায় কাদা ও নোংরা পানির কারণে চলাচলই অসম্ভব হয়ে যায়। বৃষ্টির সময় ক্রেতারাও আসতে চান না। বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ চলছে, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
ধান ব্যবসায়ী রফিক ও শামিম বলেন, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে দীর্ঘদিনের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সমাজকর্মী আব্দুস সালাম মাস্টার ও শাহ আলম মাস্টারের মতে, হাটের নিচু জায়গাগুলোতে মাটি ফেলে উঁচু করতে হবে। কর্দমাক্ত স্থানে ইটের সোলিং বা কংক্রিটের ঢালাই এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা জরুরি। পাশাপাশি হাটের শেড সংস্কার ও উন্নত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তাঁরা।
হাটের ইজারাদার কে. এম. রোকনুজ্জামান বলেন, সলঙ্গা হাটের বিভিন্ন সমস্যা ইতিমধ্যে রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল খালেক পাটোয়ারীকে জানানো হয়েছে। তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতা ও সচেতন নাগরিকেরা ঐতিহ্যবাহী সলঙ্গা হাটের দ্রুত সংস্কার ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই হাট আবারও তার ঐতিহ্য ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে।
Leave a comment