ওমর ফারুক , কক্সবাজার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, পর্যটন, সমুদ্রসম্পদ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, লবণশিল্প, কৃষি, মৎস্য, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে এ সম্ভাবনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (২৯ জুন) বেলা ১১টায় কক্সবাজার জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে জেলা জামায়াত আয়োজিত ‘কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া সংস্কার, সুশাসন ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার দলীয়করণে ব্যস্ত। নির্বাচনের চার মাস পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পথ সংকুচিত করা হয়েছে।
বর্তমান বাজেটকে ঋণনির্ভর ঘাটতি বাজেট উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলেও এবার প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনসেবামুখী খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়নি।
কক্সবাজারের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, জেলায় সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট না থাকায় বর্জ্য সরাসরি সাগরে গিয়ে পরিবেশ দূষণ করছে। অপরিচ্ছন্ন সৈকত, দালালচক্র, হকারদের বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পর্যটকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া কুতুবদিয়া-মগনামা ঘাট, মহেশখালী জেটি ও কক্সবাজার ৬ নম্বর জেটির জরাজীর্ণ অবস্থা, তীব্র যানজট, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনা, লবণ সিন্ডিকেট, কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব, শিক্ষকসংকট, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, উপকূলে জলদস্যুতা, অপহরণ, মাদক, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার চাপ জেলার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসব সমস্যা সমাধানে ভূমি প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার সেবা শতভাগ ডিজিটালাইজেশন, পুলিশ ও প্রশাসনের জবাবদিহি বৃদ্ধি, নিয়মিত গণশুনানি, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেগা প্রকল্পে স্থানীয়দের জন্য অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, লবণ সিন্ডিকেট নির্মূল, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, গুরুত্বপূর্ণ ঘাট ও জেটির দ্রুত সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, সোনাদিয়ার প্যারাবন সংরক্ষণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, দীর্ঘ সময়ের দুঃশাসনের পর মানুষ নতুন সরকারের কাছে স্বস্তি প্রত্যাশা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশে অস্থিরতা বেড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, টেকনাফে দিনদুপুরে অপহরণ, মানবপাচার, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সীমান্ত দিয়ে মাদকের পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্রও দেশে প্রবেশ করছে বলেও দাবি করেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান ও তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি টেকনাফ বন্দরকে সার্বজনীন ব্যবহারের উপযোগী করা, নতুন অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন, নাফ নদী জেলেদের জন্য উন্মুক্ত রাখা, সারা বছর সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ নিশ্চিত করা, উখিয়ায় পৌরসভা প্রতিষ্ঠা এবং মেরিন ড্রাইভকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান। পাশাপাশি সীমান্তে আরাকান আর্মির তৎপরতা রোধ এবং মাদকের বিস্তার থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর ও কক্সবাজার-১ আসনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের বৈষম্যের শিকার। তিনি কক্সবাজারের মহাপরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করা, বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে চালু করা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, মাতামুহুরী উপজেলার সদর দপ্তর গ্রহণযোগ্য স্থানে স্থাপন এবং চকরিয়ার যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি জানান।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি জনগণ মেনে নিতে পারছে না। সরকারপ্রধানের সফরের দিনও চকরিয়া-পেকুয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
কক্সবাজার-৩ আসনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী শহীদুল আলম বাহাদুর বলেন, কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শহরের যানজট নিরসন, কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা এবং মাদক প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন জেলা সাংগঠনিক সেক্রেটারি আল আমীন মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।
মতবিনিময় সভায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী, দৈনিক ইনকিলাবের কক্সবাজার অফিসপ্রধান শামসুল হক শারেক, এনটিভির প্রতিনিধি ইকরাম চৌধুরী টিপু, বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি হাসানুর রশীদ, বণিক বার্তার প্রতিনিধি ছৈয়দ আলম, চ্যানেল নাইনের প্রতিনিধি শেখ সেলিমসহ বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। এ সময় জেলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a comment