যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ইরাননীতি নিয়ে চরম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে তিনি অভিযোগ তোলেন, জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট অতীতে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের লাগামহীন কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভোটারদের দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই জনপ্রিয় নেতা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওহাইওর ক্লিভল্যান্ড ও মিশিগানের ডেট্রয়েটে আয়োজিত পৃথক কয়েকটি বিশাল নির্বাচনী সমাবেশে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে ভাষণ দেন বারাক ওবামা। মিশিগানে সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে ট্রাম্পের বেপরোয়া প্রেসিডেন্সির ওপর লাগাম টানার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ওবামা বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসনের অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত থামানোর জন্য আমাদের এই নির্বাচনী সার্কিট ব্রেকারটি চালু করতে হবে। ট্রাম্পের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এনে রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় আবারও স্পষ্ট জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের কড়া সমালোচনা করে ওবামা আরও বলেন, ‘জনগণের পকেটের অর্থ ব্যবহার করে নিজের আখের গুছাতে এতটা পারদর্শী প্রেসিডেন্ট আগে কখনো আমেরিকার ইতিহাসে দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও নীতি বেচাকেনায় তিনি যেভাবে আগ্রহী, তা অভূতপূর্ব।’ এ সময় রিপাবলিকান পার্টিকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ ও অকার্যকর রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেন সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এদিকে ওবামার তোলা বিস্ফোরক এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা না হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ‘চরম অযোগ্য শাসক’ বলে কটাক্ষ করেন এবং ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ সম্পর্কেও কটু মন্তব্য করেন।
অবশ্য রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যকার অসন্তোষের চিত্র ফুটে উঠেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করেন ট্রাম্প ও তার পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে অসংগত সুবিধা গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন ট্রাম্পের জাতীয় নীতি নির্ধারণের পেছনে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করে।
ট্রাম্পের বৈদেশিক ও সীমান্ত নীতি, বিশেষ করে ইরাননীতির কঠোর সমালোচনা করে ওবামা জানান, সামরিক পদক্ষেপের বড়াই করা সত্ত্বেও বাস্তবে ট্রাম্পের ভুল কৌশলের ফলে বিশ্ববাজারে ইরানের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সার্বিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর জবাবে ট্রাম্প অবশ্য ওবামার আমলের ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির গলদ তুলে ধরে দাবি করেন, সে সময় ইরানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সুযোগ সুবিধা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ সহজ করা হয়েছিল।
এর পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের সাজসজ্জা ও সাম্প্রতিক সংস্কারকাজ নিয়েও রসিকতা করেন ওবামা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, সেনাদের শারীরিক গঠন ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরিমাপ নিয়েই প্রশাসন বেশি ব্যস্ত। হোয়াইট হাউসের বিলাসবহুল সাজসজ্জার দিকে ইঙ্গিত করে ওবামা ঠাট্টা করে বলেন, ‘সাজসজ্জার পর হোয়াইট হাউসকে এখন এমন দেখাচ্ছে, যেন সাদ্দাম হোসেন একটি চিজকেক ফ্যাক্টরি খুলে বসেছেন।’
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারণ হবে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জয়ী হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া জোরদার করার কৌশল প্রয়োগ করবে বিরোধী দল।
Leave a comment