‘আর পারা যাচ্ছে না। বাজারে শাকসবজি থেকে শুরু করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়া—সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’ গণমাধ্যমের কাছে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা আতিকুর রহমান। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যম সারির কর্মকর্তা।
আতিকুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় তাঁর আয় বেড়েছে সামান্যই। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছুর খরচ এত বেড়েছে যে বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। আগে কিছু সঞ্চয় ছিল, সেটাও এখন প্রায় শেষের দিকে। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাব, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব—সেটাই ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না।’
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে গত মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত চার বছরে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। এর মধ্যে গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন।
এ ছাড়া প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি, যারা বর্তমানে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রয়েছেন, তাঁরাও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে আছেন বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি ব্যবস্থার দুর্বলতা।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বাংলাদেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
যে দেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল বলা হতো
একসময় দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতির অবস্থা ছিল নাজুক। তখন জনসংখ্যার বড় অংশই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সত্তরের দশকে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। কয়েক দশকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিশ্বব্যাংক।
বিবিএসের ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, সে সময় দেশে দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
তখন দারিদ্র্য বিমোচনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে—এমন আশাবাদও তৈরি হয়েছিল। তবে এরপর অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে।
প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেড়েছে দারিদ্র্য
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অফিস-আদালত, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও প্রবৃদ্ধির গতি আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।
বিবিএসের হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এর পাশাপাশি বেড়েছে দারিদ্র্য। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মোট দারিদ্র্যের হারও বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধাক্কা
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো প্রবৃদ্ধি কমার প্রবণতা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেও অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে কর্মী ছাঁটাই করে। এতে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। তাঁদের অনেকেই পরে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি।
তাঁর মতে, মহামারির পর নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রভাবও বিনিয়োগের ওপর পড়েছে।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটও রয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
মূল্যস্ফীতির চাপ
বাংলাদেশে টানা কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত দুই বছরে কিছুটা কমলেও বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
খুলনার বাসিন্দা বিলকিস আক্তার বলেন, ‘সঞ্চয় রাখব কীভাবে? সংসার চালাতেই তো হিমশিম খাচ্ছি।’
কেউ কেউ সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন। আবার কেউ কেউ জমি বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেও ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করছেন।
ঢাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘জায়গাজমি বিক্রি করে কয় দিন চলা যায়? এখন প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দেনা থাকছে।’
দরিদ্ররা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা কম পাচ্ছেন
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না।
যাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যেও দরিদ্র মানুষের প্রাপ্তি তুলনামূলক কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সমাজের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্যের কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা বেশি ভর্তুকির সুবিধা পান। ফলে এই সুবিধার বড় অংশ ধনী শ্রেণির কাছে চলে যায়।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকার ভর্তুকি দিলেও এর সুফল দরিদ্ররা সেভাবে পাচ্ছেন না।’
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমাজের ওপরের ২০ শতাংশ ধনী মানুষের জন্য ব্যয় হয়। তাই ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে আশাবাদ
সরকারের চালু করা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সঠিকভাবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবেন। তবে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে কার্ড পৌঁছানো গেলে বছরে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
সরকারের বক্তব্য
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলো আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘প্রত্যেকটাই কিন্তু বহিঃস্থ কারণ অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত।’
তিনি বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ করা সংস্কারের বিষয়গুলোও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সব মিলিয়ে, গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, জ্বালানি সংকট এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।
Leave a comment