রুশ হামলায় বিপর্যস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গতকাল সোমবার সকালে নদী পার হওয়ার বাসের অপেক্ষায় ছিলেন আলিনা বিরিউক। একসময় এই পথে চলাচল ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন সেই পথই রুশ ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গত সপ্তাহে রুশ হামলায় সেতুটি কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিয়েভের বাসিন্দাদের শহরের ভেতরে চলাচলের ধরন বারবার বদলাতে বাধ্য করাই মস্কোর নতুন কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
যানজটে আটকে থাকা সেতুটির দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বিরিউক। মাত্র দুদিন আগে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠার সময় তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে হেঁটে সেতুটি পার হচ্ছিলেন। সতর্কসংকেতের পর তাঁরা দৌড়ে সেতুর অন্য প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বিরিউক বলেন, ‘আমি দ্রুত দৌড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। চারপাশের মানুষজনও সবাইকে দ্রুত এগিয়ে যেতে বলছিল। আমার হৃদরোগে আক্রান্ত মাকেও দ্রুত হাঁটতে বলছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম, “বুকে ব্যথা করলেও কিছু যায় আসে না, কষ্টটা ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু যদি একটি শাহেদ ড্রোন এসে পড়ে, তাহলে তো সব শেষ।’
নিরাপদে বাড়ি ফেরার পর এক দিনের বিরতি নিয়েই আবার নদী পার হতে এসেছেন বিরিউক। ওপারে গিয়ে তাঁকে একটি নতুন ব্যাংক কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এটা মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। শুধু অন্য পাড়ে পৌঁছাতে হবে। মানুষের চাকরি আছে, পড়াশোনা আছে, নানা কাজ আছে।’
‘দিন-রাত শুধু ধ্বংসের ছবি’
কিয়েভের বাসিন্দাদের কাছে স্বাভাবিক জীবনযাপন এখন অনেকটা প্রয়োজনের বিষয়। তবে দিন দিন সেই কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের মার্চের পর এবারই সবচেয়ে তীব্র রুশ হামলার মুখে পড়েছে কিয়েভ।
শহরটির মেয়র ভিটালি ক্লিচকো সতর্ক করে বলেছেন, কিয়েভ ‘ভয়াবহ বা অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতির’ মধ্যে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রুশ বাহিনী শহরটিকে তছনছ করে দিচ্ছে। এ কারণে শহরের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে থাকা উচিত।
এ সপ্তাহের শেষে মস্কো কূটনীতিক ও বিদেশিদের ইউক্রেনের রাজধানী ছাড়ার আহ্বান জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিয়েভের মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ তোলে।
কিয়েভের বাসিন্দা মিকিতা কোভালচুক বলেন, নতুন করে শুরু হওয়া হামলার ভয়াবহতা নাগরিকেরা তীব্রভাবে অনুভব করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে এসব শুধু রাতে ঘটত। এখন প্রতিদিন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ঘটছে। বাড়িতে এবং কর্মস্থলের কাছে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। ঘর বা কর্মস্থলের জানালা দিয়ে তাকালে এসবের চিহ্নও দেখতে পাই।’
২৮ বছর বয়সী কোভালচুক একদিন মধ্যাহ্নভোজে হটডগ খাচ্ছিলেন। সাইরেনের বিরল বিরতির সময় শরতের রোদ উপভোগ করছিলেন তিনি। তাঁর থেকে কয়েক শ মিটার দূরে ইউক্রেনের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের পোড়া ভবনটি দাঁড়িয়ে ছিল। আগের সপ্তাহে দিনের বেলায় ড্রোন হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হামলার এক সপ্তাহ পরও সেখানে পোড়া গন্ধ ছিল। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়িগুলোও পড়ে ছিল। ঘটনাস্থলে অনেক মানুষ ছবি তুলতে থামছিলেন।
কোভালচুক বলেন, ‘জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে আমরা কোনো না কোনোভাবে মানিয়ে নিচ্ছি।’
মস্কো তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়িয়ে চলায় কিয়েভের বাসিন্দাদেরও প্রতিনিয়ত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। শপিং সেন্টার, ডাক যোগাযোগব্যবস্থা, রেলপথ, ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ডেটা সেন্টারের পর এখন সেতুও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টা করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
‘হঠাৎ করেই কান্না পায়’
কিয়েভের জনপ্রিয় ক্রিমিয়ান রেস্তোরাঁ চেইন ‘মুসাফির’-এর একটি শাখার ব্যবস্থাপক কেসেনিয়া ডোকানোভা। ২৮ বছর বয়সী এই নারী একটি বড় লাল জেনারেটর পরীক্ষা করছিলেন। শীতকালে সম্ভাব্য দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলায় জেনারেটরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেনারেটরের শব্দ তাঁকে গত শীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন রুশ হামলায় কিয়েভ টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎহীন ও তীব্র ঠান্ডার মধ্যে ছিল।
ডোকানোভা আগামী কয়েক মাসের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। একটি রেস্তোরাঁর জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হলো পানির সংকট। আমাদের রিজার্ভ ট্যাংক আছে, তবে তা বেশিদিন চলবে না।’
টেলিযোগাযোগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক দফা হামলার পর ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে কাজ চালানো হবে, তা নিয়েও ডোকানোভার দল আলোচনা করছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মীদের যাতায়াত ও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কিয়েভজুড়ে ঘনঘন বিস্ফোরণের শব্দে এখন আর আগের মতো চমকে ওঠেন না ডোকানোভা। তবে মানসিক চাপ কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো সাধারণ মুহূর্তে ট্রলিবাস বা বাসে বসে থাকলেও হঠাৎ কান্না চলে আসে। সকালে প্রস্তুত হওয়ার সময় মনে হয়—কেঁদে আর কী লাভ? আপনাকে তো সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।’
Leave a comment