একসময়ের বহুল পরিচিত ‘মিনি চম্বল’ কিংবা ‘চোরেদের গ্রাম’ হিসেবে খ্যাত এলাকা থেকে উঠে এসে ইতিহাস গড়লেন কালিমুল্লা মণ্ডল। ৬০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কঠোর অধ্যাবসায়ের জোরে জাতীয় স্তরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা NEET-এ অনন্য সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ৫৮ হাজার ৪০০ এবং স্টেট র্যাঙ্ক প্রায় ৮ হাজার নিয়ে ইতোমধ্যেই বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন। পুনিশোল গ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি চিকিৎসক হওয়ার এই মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ পেলেন।
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ওন্দা ব্লকের অন্তর্গত পুনিশোল গ্রামে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের বসবাস। বাঁকুড়ার অন্যতম বড় গ্রাম হলেও শিক্ষার হার ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে ছিল এলাকাটি। জীবিকার তাগিদে সিংহভাগ মানুষ হকারি ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষার সুযোগ না থাকায় সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে অতীতে গ্রামটির গায়ে ‘মিনি চম্বল’ বা ‘ডাকাতদের গ্রাম’ নাম জুড়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল পরিবেশ ও মানুষের কটূক্তি শুনে বড় হওয়া কালিমুল্লা তাঁর মেধা ও অদম্য ইচ্ছা দিয়ে সেই নেতিবাচক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীর নয় ভাই-বোনের পরিবারে সবার ছোট কালিমুল্লা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও পায়ের তীব্র সমস্যাকে তোয়াক্কা না করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬৪৬ নম্বর এবং পরবর্তীতে উচ্চমাধ্যমিকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। কোনো ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর না করে মূলত অনলাইন ক্লাস, নিজস্ব নোট এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের চেষ্টাতেই মেডিকেল পরীক্ষার নিখুঁত প্রস্তুতি নেন এই অদম্য তরুণ।
কালিমুল্লার এই অভূতপূর্ব সাফল্যে পুরো গ্রামজুড়ে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। তাঁর পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, এই জয় কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার এক নতুন অধ্যায়। কালিমুল্লা ভবিষ্যতে একজন দক্ষ সার্জন হয়ে অসচ্ছল মানুষের সেবা করতে চান। স্থানীয় শিক্ষক ও প্রবীণদের মতে, অতীত অপবাদ পেছনে ফেলে কালিমুল্লার এই অনন্য অর্জন এলাকার পরবর্তী প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় অনুপ্রাণিত করবে এবং গ্রামের নতুন সামাজিক পরিচয় গড়ে তুলবে।
Leave a comment