কানাডার বিভিন্ন পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার মধ্যরাত থেকে এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তা কার্যকর হলে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে প্রভাব পড়ত।
মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, কানাডার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর তা কার্যকর হবে।
পোস্টে ট্রাম্প কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল পরিবহনের জন্য প্রস্তাবিত কিস্টোন এক্সএল পাইপলাইনের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পাইপলাইনটি ‘কবর থেকে জেগে উঠতে পারে’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
প্রস্তাবিত শুল্কের আওতায় কানাডার দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহল ও আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্য পড়ার কথা ছিল। এসব পণ্যের মোট মূল্য গত বছর কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির প্রায় ৫ শতাংশ।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মঙ্গলবার জানান, শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ২১ আগস্ট দিনের শেষ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। সোমবার ও মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে কার্নির ফোনে কথা হয়। এর আগে কার্নি জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তীব্র’ পর্যায়ে রয়েছে।
কানাডার বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপে ট্রাম্প ১৯৩০-এর দশকের একটি অপেক্ষাকৃত অপরিচিত মার্কিন আইন ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। ‘সেকশন ৩৩৮’ নামে পরিচিত ওই আইনটি এভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এর প্রয়োগ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
কানাডার পণ্যে প্রস্তাবিত শুল্কের পরিধিও ছিল বেশ বিস্তৃত। শিল্প সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, আসবাব, পোশাকসহ বিভিন্ন তৈরি পণ্য এর আওতায় পড়ার কথা ছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি—ইউএসএমসিএর আওতায় সুবিধা পাওয়ার যোগ্য পণ্যও এই শুল্ক থেকে ছাড় পেত না।
কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধজাত পণ্য, গাড়ি ও অ্যালকোহল রপ্তানিতে বাধা দিচ্ছে। এর আগে আরোপ করা ট্রাম্পের শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছিল কানাডা। চীনের পর কানাডাই ছিল একমাত্র দেশ, যারা ওই শুল্কের জবাবে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। পরে কার্নি এসব ব্যবস্থার বেশির ভাগই প্রত্যাহার করেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী এর আগে ট্রাম্পের শুল্ককে ইউএসএমসিএ চুক্তির ‘সরাসরি লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মতে, এই বাণিজ্য বিরোধ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্সও মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছিল, নতুন করে শুল্ক বাড়ানো হলে দুই দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ব্যয় বাড়তে পারে, সরবরাহব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হতে পারে এবং ইউএসএমসিএর আওতায় দুই দেশের বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক আরোপের হুমকি শেষ পর্যন্ত কানাডার সঙ্গে আলোচনায় চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। আগের দফার শুল্কে কানাডার অর্থনীতি ইতিমধ্যে চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশ বৃহত্তর বাণিজ্য বিরোধের সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে ইউএসএমসিএ চুক্তির পর্যালোচনাও সামনে রয়েছে। ফলে আলোচনায় ট্রাম্পের হাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
Leave a comment