পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের পাত্র—দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সর্বত্রই প্লাস্টিকের ব্যবহার। পোশাক, প্রসাধনী ও টুথপেস্টের মতো কিছু পণ্যেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। ৫ মিলিমিটারের কম আকারের এসব কণাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক।
খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টাসহ শরীরের বিভিন্ন নমুনায় এসব কণা শনাক্ত হয়েছে। তবে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই নির্দিষ্ট কোনো রোগ হবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।
খাবার ও পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশের অন্যতম পথ খাবার ও পানি। পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পানি ও খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। মাছ, সামুদ্রিক খাবার, লবণসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
বাতাসের মাধ্যমেও এসব কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সিন্থেটিক কাপড়, প্লাস্টিকজাত বিভিন্ন পণ্য ও ঘরের ধুলায় থাকা ক্ষুদ্র কণা শ্বাস নেওয়ার সময় নাক ও ফুসফুসে পৌঁছাতে পারে। তবে শরীরে প্রবেশ করা সব মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তে পৌঁছায় না। কণার আকার ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে এর একটি অংশ শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে।
রক্ত ও বিভিন্ন অঙ্গে শনাক্ত
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, মানুষের শরীরের ভেতরেও এসব কণা শনাক্ত হয়েছে। রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা ও শরীরের অন্যান্য নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
কিছু গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির সঙ্গে শরীরে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতির মতো পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে মাইক্রোপ্লাস্টিকই এসব পরিবর্তনের কারণ।
হৃদ্রোগের সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আলোচিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয় নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ। গবেষকেরা ঘাড়ের ধমনিতে জমা প্লাকের নমুনা পরীক্ষা করে কিছু রোগীর শরীরে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব রোগীর প্লাকে এসব কণা পাওয়া গিয়েছিল, তাঁদের পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণেই এসব ঘটনা ঘটেছে। গবেষণাটি মূলত একটি সম্পর্কের কথা বলেছে; কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
ফুসফুস ও অন্য অঙ্গ নিয়েও গবেষণা
শ্বাসের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসে পৌঁছাতে পারে। কিছু গবেষণায় এসব কণার সঙ্গে ফুসফুসে প্রদাহসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। প্লাসেন্টা এবং পুরুষের প্রজননসংক্রান্ত নমুনাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে অ্যাজমা, বন্ধ্যত্ব, ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি বা ক্যানসার হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা এখন প্রায় অসম্ভব। তবে কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো যেতে পারে।
গরম খাবার বা পানীয় রাখার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমে।
খাবার গরম করার সময়ও সতর্ক থাকা দরকার। যে পাত্রে খাবার গরম করা হবে, সেটি মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী কি না দেখে নিতে হবে। সব ধরনের প্লাস্টিকের পাত্র খাবার গরম করার জন্য উপযুক্ত নয়।
ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার করাও ভালো অভ্যাস। বিশেষ করে ধুলা জমে থাকা জায়গাগুলো ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, কাপসহ একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বদলে সম্ভব হলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্প ব্যবহার করা যায়।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং শরীরের বিভিন্ন নমুনায় এসব কণা শনাক্ত হয়েছে—এ বিষয়ে এখন যথেষ্ট গবেষণা রয়েছে। তবে এর কারণে মানুষের কী ধরনের রোগ হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কতটা, সে বিষয়ে এখনো অনেক কিছু জানার বাকি।
তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ ব্যবহারে সচেতন হওয়াই ভালো।
Leave a comment