২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলার সময় জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন পুলিশ সদস্য আব্দুল মালেক। হামলার মধ্যে ছোট ভাইকে ফোন করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের থানা আক্রমণ করেছে। মনে হয় আর বাঁচব না। সন্তানগুলোর খেয়াল রাখিস।’ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই তুলে ধরেন তিনি।
আব্দুল মালেক বেঁচে ফিরলেও ওই হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)সহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে ঘটনাস্থল ও থানার আশপাশ থেকে ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আরও দুজন মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত এক পুলিশ সদস্যের মরদেহ থানার পাশের একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
বাড়ি বাড়ি খুঁজে হামলার অভিযোগ
হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর প্রাণ বাঁচাতে অনেক পুলিশ সদস্য থানার পেছন দিয়ে পালিয়ে আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তবে হামলাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের খুঁজে বের করে মারধর করেন বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
থানার পেছনের একটি বাড়ির বাসিন্দা বিবিসি বাংলাকে জানান, বাথরুমে লুকিয়ে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বের করে মারধর করা হয়। পরে বাড়ির সামনেই কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।
অস্ত্র লুট, উদ্ধার হয়নি ছয়টি
এনায়েতপুর থানার তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় ১৮টি রাইফেল, পিস্তল ও শটগান লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ছয়টি অস্ত্র এবং অধিকাংশ গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
‘হাজার হাজার মানুষ থানায় আক্রমণ করে’
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে পাঁচ থেকে ছয় হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে থানার সামনে আসেন। প্রথম দফায় পুলিশের অনুরোধে তারা সরে গেলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আবারও কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়ে থানায় হামলা চালান।
একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ওই দিন সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষ মারমুখী হয়ে থানায় সরাসরি আক্রমণ করে। আমরা টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছিলাম। কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ওসি (তদন্ত)সহ চারজন পুলিশ সদস্য থানার পানির ট্যাংকের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। পরে সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
‘লাশবাহী গাড়িতে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল’
হামলার পর পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ৬ আগস্ট তাঁদের লাশবাহী গাড়িতে কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হয় বলে জানান আব্দুল মালেক।
অন্তঃসত্ত্বা কনস্টেবল নিহতের গুজব
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী কনস্টেবল নিহত হয়েছেন—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিবিসি বাংলাকে ওই নারী কনস্টেবল জানান, তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না।
তাঁর ভাষ্য, মারধরের সময় এক সহকর্মী তাঁকে বাঁচানোর জন্য হামলাকারীদের বলেন, তাঁর গর্ভে সন্তান রয়েছে। এরপরও মারধর বন্ধ হয়নি। একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান।
তিনি বলেন, ‘আমার পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথায় সেলাই দিতে হয়েছিল।’
হত্যা মামলা ও তদন্ত
পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের চার নেতাসহ অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রধান আসামি ছিলেন এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চু। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান জানান, এনায়েতপুরের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত এখনো চলমান।
মামলার বাদী এসআই আব্দুল মালেক বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায় তিনি মামলার এজাহারে স্বাক্ষর করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এজাহার অন্যরা লিখেছিলেন। আমাকে শুধু কোথায় স্বাক্ষর করতে হবে, সেটি বলা হয়েছিল।’
এদিকে, সে সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেন, তৎকালীন পরিস্থিতির চাপে পুলিশকে দ্রুত মামলা নিতে হয়েছিল।
Leave a comment