মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে স্রেফ ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ বলে অভিহিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার যে পরিকল্পনার কথা শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, তাকে অনেকেই বিএনপির সাবেক ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ ঘোষণার সঙ্গে তুলনা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমর্থনহীন ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রীর পক্ষে এমন বড় ঝুঁকি নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এমন একাধিক ফোনালাপ ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তাকে ‘খুব দ্রুত দেশে ফিরছেন’ বলে দাবি করতে শোনা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “কোন ডিসেম্বর? তিনি তো নির্দিষ্ট করে বলেননি এই ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই আসবেন, নাকি পরের কোনো ডিসেম্বরে।” তিনি মনে করেন, এটি মূলত দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার একটি অপকৌশল মাত্র। শেখ হাসিনা দেশে এলে তার পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, বরং গণঅভ্যুত্থানের সপক্ষে থাকা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ও জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ (এনসিপি) সব শক্তি মুহূর্তের মধ্যে একাট্টা হয়ে যাবে। তাছাড়া নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মী হিসেবে তারা মাঠে নামলেই গ্রেফতারের মুখোমুখি হবে।
রাজনীতির এই বিশ্লেষক আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে শীর্ষ স্তরের নেতা-কর্মীরা বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে চরম ভোগবাদী শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। এদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে বিদেশের বিলাসী জীবন ছেড়ে দলের জন্য তারা কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি বা আন্দোলনে শামিল হবেন না। একই সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের চীনমুখী কূটনীতি এবং তিস্তা প্রকল্পের নানামুখী উদ্যোগের কারণে ভারতও হয়তো অদূর ভবিষ্যতে শেখ হাসিনাকে নিজেদের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক বোঝা’ মনে করতে শুরু করবে।
একই বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চাল হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যে আত্মসমর্পণ করবেন, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এটি আসলে পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি।” তার মতে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মূলত দেশের কঠোর আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে ফাঁকি দিতেই যিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তিনি নিজে থেকে ফিরে এসে সেই আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি নেবেন না বলেই মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় এই দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
Leave a comment