Home জাতীয় সুন্দরবনে মধু আহরণ ছয় বছরের সর্বনিম্ন, দস্যু আতঙ্ক ও জলবায়ুর প্রভাবে সংকটে মৌয়াল
জাতীয়

সুন্দরবনে মধু আহরণ ছয় বছরের সর্বনিম্ন, দস্যু আতঙ্ক ও জলবায়ুর প্রভাবে সংকটে মৌয়াল

Share
Share

ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট


চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মাত্র ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। বনদস্যুদের আতঙ্ক, মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই মাসব্যাপী মধু আহরণ মৌসুমে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ থেকে মোট ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। গত বছর একই সময়ে সংগ্রহ হয়েছিল ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল।

মধু আহরণ কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে। চলতি মৌসুমে মধু থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ মৌয়ালের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া। ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করলেও চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ হাজার ৪৭৯ জনে।

মৌয়ালদের ভাষ্য, বাঘের আক্রমণের চেয়েও এখন বড় আতঙ্ক বনদস্যুরা। জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে অনেক পেশাদার মৌয়াল এবার বনের গভীরে যেতে চাননি। ফলে মধু সংগ্রহের পরিমাণও কমেছে।

শরণখোলা ও খুলনা রেঞ্জের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাথাপিছু মধু আহরণের হার প্রায় একই থাকলেও মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মোট উৎপাদন কমেছে। এর প্রভাব বাজারেও পড়েছে। খলিশা ও গরান ফুলের মধুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গাছে ফুল কম ফুটছে। আবার আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতার কারণে ফুল দ্রুত ঝরে পড়ায় মৌমাছি পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করতে পারছে না।

পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনদস্যু দমনে র‌্যাব, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনের মধু ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদন কমতে থাকলে সেই সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবননির্ভর হাজারো মানুষের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।

তাঁদের মতে, বননির্ভর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের মধু উৎপাদন ও এ-সংক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী পেশা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

সৌদির সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের ১৫ জনই নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর বাসিন্দা

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারানো ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। উদ্ধার...

দুই মাসে সব ইউনিটে কমিটি পুনর্গঠন করবে এনসিপি

আগামী দুই মাসের মধ্যে দেশের সব ইউনিটে কমিটি পুনর্গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে চলতি আগস্টে আরও ১০০টি উপজেলা...

Related Articles

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে, টিসি পাওয়া সেই শিক্ষার্থী আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে সহপাঠী বা কিশোর কর্তৃক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পর বিদ্যালয় থেকে...

‘সাকিব ভালো খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু তিনি নষ্ট পচে যাওয়া মানুষ’

সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ‘একজন নষ্ট পচে যাওয়া...

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষা, ঋতুর জিপিএ-৫

যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের ঋতু খাতুন বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই ২০২৬...

এসএসসিতে চার বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে শেরপুরে পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চার বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার ধাক্কা সামলাতে না পেরে শেরপুরের...