ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর আশায় মানবপাচারকারী চক্রের লোভনীয় প্রলোভনে পড়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন ১৮ বাংলাদেশি যুবক। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের বৈরী আবহাওয়া আর পাচারকারীদের নির্মমতায় সলিলসমাধি হয়েছে তাদের। মর্মান্তিক এই ঘটনায় জড়িত আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে (৫২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত সোমবার সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ (টিএইচবি) ইউনিট তাকে আটক করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার মিকাইল সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই ঘটনায় ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো এক যুবকের বাবার দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, নিহত যুবক ও মিকাইল একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা দূর করে উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর ওই যুবককে গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ১৩ লাখ টাকার চুক্তি করে এই পাচারকারী চক্র।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর জন্য সাড়ে ৫ লাখ এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর বাকি সাড়ে ৭ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় যুবকের পরিবার ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে। এরপর পাচারকারীরা তাকে ঢাকায় ১৭ দিন আটকে রেখে অন্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর পাচারকারীদের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভুক্তভোগীর বাবা ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা এবং মিকাইলের হাতে সরাসরি নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন।
টাকা পাওয়ার পর গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে একটি ছোট নৌযানে করে মাসুমসহ ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাগরের প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌযানটি মাঝপথে বিকল হয়ে দিনের পর দিন ভাসতে থাকে। তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে নৌকার যাত্রীরা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ওই যুবকসহ ১৮ জন বাংলাদেশি মারা যান।
পরবর্তীতে জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, পাচারকারীদের নির্মম নির্দেশে নিহতদের মরদেহ সাগরেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ট্র্যাজেডির খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই যুবকের পরিবার তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এই ঘটনায় দিরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করা হলে সিআইডি তদন্তভার গ্রহণ করে এবং মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment