অতিরিক্ত প্রোটিন কি লিভারের জন্য ক্ষতিকর?
ওজন কমানো, পেশি গঠন কিংবা শরীরচর্চার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে আলোচিত পুষ্টি উপাদানগুলোর একটি হলো প্রোটিন। জিম সংস্কৃতি, কিটো ডায়েট ও লো-কার্ব খাদ্যাভ্যাসের জনপ্রিয়তায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রোটিন গ্রহণ করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ সব সময় উপকারী নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি লিভারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রোটিন শরীরের জন্য অপরিহার্য হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস ও স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি
বর্তমানে ফ্যাটি লিভার রোগ, যা এখন ‘স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ নামে পরিচিত, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এ রোগের প্রধান কারণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের প্রবণতা বাড়ছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং দ্রুত ওজন কমানোর জন্য ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ অনুসরণ করার প্রবণতাও এ রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে উচ্চ-প্রোটিন খাদ্যাভ্যাস
দ্রুত ওজন কমানো এবং পেশি গঠনের লক্ষ্যে অনেকেই এখন মুরগির মাংস, ডিম ও বিভিন্ন প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। কিন্তু শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রোটিন গ্রহণ সব সময় বাড়তি উপকার বয়ে আনে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই জানেন না তাঁদের শরীরের প্রকৃত প্রোটিন চাহিদা কত। ফলে অজান্তেই অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করছেন।
অতিরিক্ত প্রোটিন কি লিভারের ক্ষতি করে?
সুস্থ লিভার সাধারণত প্রোটিন প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। তবে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে অতিরিক্ত প্রোটিন বিপাকে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে শরীরে নাইট্রোজেনজাত বর্জ্য পদার্থ জমে লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস বা স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণও লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা শুধু প্রোটিন নয়; বরং উচ্চ-প্রোটিন, কম আঁশযুক্ত এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাসই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- সব সময় ক্লান্ত লাগা
- পেট ফোলা বা অতিরিক্ত মেদ জমা
- হজমের সমস্যা
- বমি বমি ভাব
- লিভার এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
- প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে জন্ডিস
প্রতিদিন কতটুকু প্রোটিন প্রয়োজন
ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (আইসিএমআর) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রায় ০.৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন।
অন্যদিকে নিয়মিত উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ চাহিদা প্রতি কেজি ওজনে ১.২ থেকে ১.৬ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেসব অভ্যাস ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়
- উচ্চ-প্রোটিন কিন্তু কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত প্রোটিনজাত খাবার
- সম্পূর্ণভাবে কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া
- প্রোটিনের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি বা কোমল পানীয় গ্রহণ
- গভীর রাতে ভারী খাবার খাওয়া
লিভার সুস্থ রাখতে করণীয়
- প্রোটিনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ
- নিয়মিত ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যজাত খাবার খাওয়া
- ডাল, শিম ও বিভিন্ন বীজজাতীয় উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখা
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করা
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোহান বাদাভ বলেন, “প্রোটিন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেশি খেলেই বেশি উপকার হবে—এ ধারণা সঠিক নয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার সুস্থ রাখতে কোনো একক পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে পরিমিত মাত্রায়।
Leave a comment