পাকিস্তানের লাহোরে তিন সন্তানের সামনে এক ফরাসি নারী পর্যটককে মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দীর্ঘ ছয় বছর পর চূড়ান্ত আইনি রায় এসেছে। এই বর্বরোচিত ও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলার প্রধান দুই আসামি আবিদ মালহি এবং শফকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন পাকিস্তানের উচ্চ আদালত। বুধবার (৩ জুন) আদালত আসামিপক্ষের করা আপিল আবেদন সরাসরি খারিজ করে এই আদেশ দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা দ্য ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার চেয়েও জঘন্য এই অপরাধের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। মামলার নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ফরাসি নাগরিক তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে নিজস্ব গাড়িতে করে লাহোর-শিয়ালকোট মহাসড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে হঠাৎ গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তিনি রাস্তার পাশে গাড়ি থামাতে বাধ্য হন এবং সাহায্যের অপেক্ষা করতে থাকেন। এ সময় সুযোগ বুঝে দুই সশস্ত্র দুর্বৃত্ত গাড়ির জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা অস্ত্রের মুখে ওই নারীকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায় এবং তাঁর অবুঝ সন্তানদের সামনেই তাঁকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। পাশবিক নির্যাতন শেষে আসামিরা ওই নারীর কাছে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার এবং ব্যাংক কার্ড লুট করে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার পর পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ভুক্তভোগী নারীর দেওয়া বর্ণনা ও আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়েক দিনের মধ্যে আবিদ ও শফকতকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে সংগৃহীত ডিএনএ(DNA) নমুনার সঙ্গে আসামিদের ডিএনএ-র শতভাগ মিল পাওয়া যায়। বিচারিক শুনানির সময় ভুক্তভোগী নারী নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে আসামিদের শনাক্ত করেন এবং এক আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে পাকিস্তানের একটি বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী আদালত (ATC) দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ সম্পন্ন করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। নিম্ন আদালতের ওই সাজার বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার তা খারিজ করা হয়।
উল্লেখ্য, এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন লাহোর পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মন্তব্য—”নারীটি কেন গভীর রাতে পুরুষ সঙ্গী ছাড়া একা বের হয়েছিলেন”—তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার (Victim Blaming) এই মানসিকতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। এই রায়কে দেশটির বিচার ব্যবস্থায় নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
Leave a comment