মা-বাবা প্রতিটি সন্তানের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার ও সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। জন্মের পর থেকে সন্তানকে পরম স্নেহে আগলে রাখা, তাদের সুস্থ, সুন্দর ও উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য মা-বাবার ত্যাগ ও সংগ্রামের কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক সমাজে অনেক সন্তানই প্রতিষ্ঠার আলোয় অন্ধ হয়ে মা-বাবার শেষ বয়সের অবলম্বন হওয়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ান।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে অসহায় বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের নৃশংস ও অমানবিক ঘটনাটি পুরো দেশের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র গণক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর দেশে মা-বাবার আইনি অধিকার রক্ষা ও সন্তানের আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে。
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার উপযুক্ত ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই আইনের প্রধান প্রধান ধারাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
• যৌথ দায়িত্ব: কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে, সে ক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও যাবতীয় মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করবে।
• একত্রে বসবাস ও ইচ্ছার মূল্যায়ন: প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একই সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তানই তাঁর পিতা বা মাতাকে (কিংবা উভয়কে) তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস (ওল্ড হোম) কিংবা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না।
• নিয়মিত খোঁজখবর: সন্তানকে নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও উপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
• পৃথক বসবাসের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎ ও আর্থিক সহায়তা: মা-বাবা যদি সন্তানদের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করেন, তবে সন্তানকে নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানের দৈনন্দিন আয়-রোজগার, মাসিক বা বাৎসরিক আয় থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা-মাতাকে নিয়মিত প্রদান করতে হবে।
• দাদা-দাদী ও নানা-নানীর অধিকার: পিতা-মাতার অবর্তমানে বা অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদী এবং নানা-নানীর ভরণপোষণ প্রদানের ক্ষেত্রেও এই একই আইনি বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে।
কোনো সন্তান যদি এই আইনের কোনো ধারা বা উপধারার বিধান লঙ্ঘন করেন, তবে তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
১. মূল দণ্ড: আইন অমান্যকারী সন্তানকে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে এবং উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
২. সহযোগিতাকারীর শাস্তি: কোনো সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণ প্রদানে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তিনিও এই অপরাধে উসকানি বা সহায়তা দিয়েছেন বলে গণ্য হবেন এবং একই অপরাধে (১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের জেল) দণ্ডিত হবেন।
আইনি কার্যপ্রক্রিয়ার সুবিধার্থে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আইনের অধীনে আনীত যেকোনো অপরাধ বা মামলা আমলযোগ্য (Cognizable), জামিনযোগ্য (Bailable) এবং আপোষযোগ্য (Compoundable) হবে।
মিরপুরের নূরজাহান বেগমের মতো আর কোনো মা-বাবাকে যেন সন্তানদের চরম অবহেলা ও নির্মমতার শিকার হয়ে একাকী মৃত্যুবরণ করতে না হয়, সেজন্য এই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি ।
Leave a comment