Home আন্তর্জাতিক ইরানের হামলায় ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত: বিবিসি
আন্তর্জাতিক

ইরানের হামলায় ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত: বিবিসি

Share
Share

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান সংঘাতের শুরু থেকেই তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে পেন্টাগন বারবার খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করলেও, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এবার একদম ভিন্ন ও চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। মহাকাশ থেকে পাওয়া অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের সময় ইসলামিক রিপাবলিকের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আজ সোমবার (১ জুন) প্রকাশিত ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর বিশেষ ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন রণকৌশলগত ঘাঁটিগুলোতে ইরান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছিল। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে একাধিক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট ডেটা এবং বিশ্বখ্যাত স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট’-এর সংরক্ষিত আর্কাইভ ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

সংঘাতের শুরু থেকেই ওয়াশিংটন ও হোয়াইট হাউস দাবি করে আসছিল যে, পশ্চিমা মিত্রদের যৌথ অভিযানে ইরানের সামরিক ও বিমান সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্রে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে যে ধরনের ধংসযজ্ঞের ক্ষতচিহ্ন উন্মোচিত হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে ইরানের পাল্টা হামলা মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশ্যে স্বীকার করা তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত, কৌশলগত এবং ব্যাপক ছিল।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত ‘আল রুওয়াইস’ ও ‘আল সাদ’ বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের বিখ্যাত ‘মুওয়াফফাক সালতি’ বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা তিনটি অত্যন্ত আধুনিক ‘অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ ইরানের আঘাতে অকেজো ও ধ্বংস হয়ে গেছে।

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবির বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, সৌদি আরবের ‘প্রিন্স সুলতান’ বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী (ট্যাঙ্কার) এবং আকাশপথে নজরদারি করার বিশেষ বিমানগুলোও ইরানের দূরপাল্লার হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ‘মিলিটারি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেসমেন্ট রিসার্চ’ (MAIAR)-এর একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দামি ও অত্যাধুনিক ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ (E-3 Sentry) নজরদারি বিমান শনাক্ত করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নথি অনুযায়ী, এমন একটি যুদ্ধকালীন নজরদারি বিমান নতুন করে প্রতিস্থাপন করতে পেন্টাগনের প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার (৭০০ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এছাড়া কুয়েতের ‘আলি আল সালেম’ বিমানঘাঁটি এবং ‘ক্যাম্প আরিফজান’-এর ভেতরেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব শনাক্ত করা গেছে।

এমএআইএআর-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা স্যাটেলাইট ছবিতে ধসে পড়া মার্কিন জ্বালানি সংরক্ষণ বাঙ্কার, বিমানের সুরক্ষিত হ্যাঙ্গার এবং মার্কিন সেনাদের আবাসন ছাউনি চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তীব্র সংঘাতের সময় এই ঘাঁটিগুলো কেবল একবার নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছিল। অন্যদিকে বিশ্বখ্যাত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ‘জেনস’ (Janes) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে মার্কিন বাহিনীর প্রধান স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলো ইরানের নিখুঁত আঘাতে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সাম্প্রতিকতম ও ভয়ঙ্কর উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। এর চরম প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও তার মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা শুরু করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেলের বাজারের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ সামরিকভাবে বন্ধ করে দেয়

পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানের জোরালো মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে এরপর ইসলামাবাদের টেবিলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বা চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমানে দুই পক্ষই সুইজারল্যান্ড বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একে অপরের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবের খসড়া পাঠিয়ে আলোচনা সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

কঙ্গোর তানগানিকা হ্রদে ভয়াবহ নৌকাডুবি: নিহত ৪১

মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিখ্যাত তানগানিকা হ্রদে যাত্রীবাহী একটি নৌকা ডুবে অন্তত ৪১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায়...

জাতিসংঘে ভাষণের পরই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লেন নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তেজনার মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে ভাষণ দান শেষে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। নিউইয়র্কে...

Related Articles

ফিলিস্তিনিদের চলাচলে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র কড়াকড়ি, স্থবির জীবনযাত্রা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা এবং এর পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের চলাচলের...

শচীনের চেয়েও প্রতিভাবান সেই বিনোদ কাম্বলির ঠাঁই এখন বৃদ্ধাশ্রমে!

একসময় যাকে ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের চেয়েও প্রতিভাবান ব্যাটার হিসেবে বিবেচনা করা...

ডিআর কঙ্গোতে সেনাবাহিনীর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ১৭

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) সেনাবাহিনীর একটি বিয়োগান্তক বিমান দুর্ঘটনায় অন্তত ১৭...

গাজা পুনর্গঠনে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ কর্তৃত্ব দাবি চীনের, জাতিসংঘে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের তাগিদ

চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনের সার্বিক শাসনভার এবং গাজার...

;