ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশের রাজধানী চঘচরনের একটি ধূলিময় চত্বরে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান শত শত মানুষ। তীব্র শীত আর ধুলোবালির মধ্যে তাদের এই অপেক্ষার একমাত্র কারণ—যদি কেউ এসে দিনমজুর হিসেবে কোনো কাজের সন্ধান দেয়। এই চত্বরের দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষদের দৈনিক ভাগ্যই নির্ধারণ করে, আজ রাতে তাদের সন্তানদের কপালে এক টুকরো শুকনো রুটি জুটবে কি না। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এই দেশটিতে এখন কাজ পাওয়া লটারি পাওয়ার মতোই অলীক।
৪৫ বছর বয়সী জুমা খান গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দিনশেষে তার আয় ছিল বড়জোর দেড় শ থেকে দুই শ আফগানি (২.৩৫-৩.১৩ ডলার)। রুদ্ধকণ্ঠে জুমা খান বলেন, “আমার সন্তানরা টানা তিন রাত না খেয়ে ঘুমাতে গেছে। স্ত্রী-সন্তানদের কান্না সহ্য করতে না পেরে আটা কেনার জন্য প্রতিবেশীর কাছে হাত পেতেছি। প্রতিটা মুহূর্ত কাটে এই আতঙ্কে—এই বুঝি আমার সন্তানরা না খেয়ে চোখের সামনে মারা গেল।”
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি এক মানবিক বিপর্যয়কে নির্দেশ করছে। দেশের প্রতি চারজন নাগরিকের মধ্যে তিনজনই তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারছেন না। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে বেকারত্ব আকাশচুম্বী, ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত এবং একসময়ের জীবন রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক ত্রাণ এখন যৎসামান্য। দেশটির জনসংখ্যার এক-দশমাংশেরও বেশি—প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ—বর্তমানে চরম দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘোর প্রদেশ এই সংকটের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। চঘচরনের প্রধান কবরস্থানে এখন প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের ছোট কবরের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ, যা অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্রকে প্রমাণ করে।
এই চরম বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য আফগান পিতারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা যেকোনো মানুষের হৃদয়কে চূর্ণ করে দেয়। আব্দুল রশিদ আজিমি নামের এক হতদরিদ্র পিতা তার সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তান রোকিয়া এবং রুহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমি আমার মেয়েদের বিয়ের জন্য অথবা গৃহকর্মের জন্য বিক্রি করতে রাজি। আমি ঋণে জর্জরিত ও নিরুপায়। কাজ থেকে যখন শূন্যহাতে ফিরি, সন্তানরা এসে রুটি চায়। আমি তাদের কী দেব? একটি মেয়েকে বিক্রি করলে যে অর্থ পাব, তা দিয়ে বাকি সন্তানদের অন্তত চার বছর খাওয়াতে পারব।”
একই প্রদেশের বাসিন্দা সাইদ আহমদ তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শাইকাকে বাঁচাতে তাকে এক আত্মীয়ের কাছে ২ লাখ আফগানির (৩,২০০ ডলার) বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। শাইকার অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট হয়েছিল। সাইদ বলেন, “চিকিৎসার খরচ জোগানোর কোনো উপায় ছিল না। অস্ত্রোপচার না হলে মেয়েটি মরেই যেত। এভাবে বিক্রি করায় সে অন্তত বেঁচে তো থাকবে। ক্রেতার সাথে চুক্তি হয়েছে—বাকি টাকা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শোধ করে সে আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে।”
বিগত দুই বছর আগেও আফগানিস্তানের লাখ লাখ পরিবার আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল। কিন্তু একসময়ের শীর্ষ দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো তালেবানের নারী শিক্ষা ও মানবাধিকার বিরোধী নীতির প্রতিবাদে অনুদান প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে এসে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশজুড়ে চলা ভয়াবহ খরা।
তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এই পরিস্থিতির জন্য বিগত মার্কিন প্রশাসনকে দায়ী করে বিবিসিকে বলেন, “আগ্রাসনের ২০ বছরে এখানে একটি কৃত্রিম অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল। আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে শুধু দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পেয়েছি।” মানবিক সাহায্যকে রাজনৈতিক রূপ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি খনি ও অবকাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশ্বাস দেন।
তবে চঘচরনের প্রাদেশিক হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের দৃশ্য বলছে, এই দীর্ঘমেয়াদী আশ্বাস বর্তমানের ক্ষুধার্ত শিশুদের বাঁচাতে পারছে না। হাসপাতালের আইসিইউ-তে অধিকাংশ ওষুধ নেই, চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে অনেক পরিবার মুমূর্ষু শিশুদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জরুরি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ছাড়া এই লাখ লাখ আফগান নাগরিকের স্রেফ বেঁচে থাকাটাই এখন এক অসম্ভব লড়াই।
Leave a comment