যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরের হাই স্ট্রিট বা প্রধান বাণিজ্যিক সড়কগুলোর মিনি-মার্ট, ভেইপ শপ এবং নাপিতের দোকানগুলোর আড়ালে গড়ে ওঠা সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের অন্ধকার সাম্রাজ্য উন্মোচন করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। দীর্ঘ এক বছর ধরে চালানো বিবিসির এক বিশেষ ও গোপন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে দেশটির সরকার। হাই স্ট্রিটগুলোকে অপরাধমুক্ত করতে এবং এসব ছদ্মবেশী গ্যাংগুলোকে সমূলে উৎপাটন করতে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৪শ কোটি টাকা) ব্যয়ে একটি নতুন ‘হাই স্ট্রিট সংগঠিত অপরাধ দমন ইউনিট’ (High Street Organised Crime Unit) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গত ১২ মাসেরও বেশি সময় ধরে বিবিসি নিউজ তাদের অনুসন্ধানে দেখিয়েছে, কীভাবে সাধারণ দোকানের আড়ালে মাদক চোরাচালান, অবৈধ তামাক ও ভেইপ বিক্রি, অর্থ পাচার, অবৈধ অভিবাসন এবং শিশু যৌন শোষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন বছর ধরে যুক্তরাজ্যজুড়ে এই বিশেষ আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম পরিচালনা করবে দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। এই কার্যক্রমে তৃণমূল পর্যায়ে অপরাধ দমনে ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস বিভাগকেও বড় অঙ্কের আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
নিরাপত্তা মন্ত্রী ড্যান জার্ভিসের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই নতুন ইউনিটটি কাজ করবে। মূলত ২০২৫ সালের শরৎকালীন বাজেটে এই ইউনিটের খসড়া রূপরেখা দেওয়া হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার এখন এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রী ড্যান জার্ভিস বিবিসি নিউজকে বলেন, “আগামী মাসগুলোতে দেশজুড়ে হাই স্ট্রিটের সন্দেহভাজন দোকানগুলোতে হাজার হাজার আকস্মিক অভিযান চালানো হবে। আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, এই সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে আমরা বহু শীর্ষ সংগঠিত অপরাধীকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠাতে সক্ষম হব এবং কোটি কোটি পাউন্ডের অবৈধ কালোটাকা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।” তিনি আরও জানান, এনসিএ, ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস, স্থানীয় পুলিশ এবং রাজস্ব বিভাগ (এইচএমআরসি)-এর যৌথ সমন্বয়ে এবার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিখুঁত অপারেশন চালানো হবে।
বিবিসির অনুসন্ধানী দল গত বছরের মে ও জুন মাসে আধুনিক হাই স্ট্রিটের মিনি-মার্টগুলোর নিচে অবৈধ সিগারেটের বিশাল চালানের সন্ধান পায়, যা মাটির নিচে গোপন সুড়ঙ্গ তৈরি করে সরবরাহ করা হচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানায়, নকল তামাকের এই কালোবাজারি থেকে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন পাউন্ডের অবৈধ মুনাফা আসছে, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে হেরোইন ও কোকেনের ব্যবসার সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
তৎকালীন অভিবাসন মন্ত্রী সীমা মালহোত্রা একে একটি “জাতীয় কেলেঙ্কারি” এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার একে একটি “লজ্জাজনক ঘটনা” বলে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় জানা যায়, গোটা যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩,৭০০টি এমন অবৈধ দোকান ধোকা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। শুধু তাই নয়, গত নভেম্বর মাসে বিবিসি ফাঁস করে যে, কীভাবে নগদ টাকার বিনিময়ে এসব দোকানে অবৈধ আশ্রয়প্রার্থীদের দাস হিসেবে কেনাবেচা করা হচ্ছে এবং অপরাধী চক্রের প্রধানদের ওপর আরোপিত ৬০,০০০ পাউন্ডের সরকারি জরিমানা জালিয়াতির মাধ্যমে মুছে দেওয়া হচ্ছে। এই চক্রের পেছনে একটি শক্তিশালী কুর্দি সংগঠিত অপরাধী দল সক্রিয় রয়েছে বলেও বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি আসে চলতি বছরের মার্চ মাসে, যখন ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের হাই স্ট্রিট মিনি-মার্টগুলোতে ১১ বছর বয়সী শিশুদেরও যৌন নির্যাতন ও শোষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ মেলে। এমনকি এসব দোকানে কোকেন, গাঁজা, লাফিং গ্যাস এবং প্রেসক্রিপশনের নিষিদ্ধ ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছিল। এই আইনহীন পরিস্থিতির জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, সরকার এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় “পুরোপুরি মনোযোগী” এবং অপরাধীদের দমনে অতিরিক্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ ও পুলিশকে আরও শক্তিশালী আইনি ক্ষমতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
চার্টার্ড ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউট (সিটিএসআই)-এর প্রধান নির্বাহী জন হেরিম্যান জানান, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস-এর বাজেট প্রায় ৫০% কাটছাঁট করার ফলেই হাই স্ট্রিটগুলোতে অপরাধীরা ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে আদালত অপরাধের দায়ে কোনো দোকান সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বন্ধ করতে পারে। তবে সিটিএসআই দাবি জানিয়েছে, এই শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে যেন ১২ মাস করা হয় এবং গুরুতর অপরাধীদের ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। নিরাপত্তা মন্ত্রী জার্ভিস নিশ্চিত করেছেন যে, আইন পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার একটি জরুরি পর্যালোচনা শুরু করেছে।
এদিকে, সরকারের এই মেগা পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দল কনজারভেটিভরা। শ্যাডো হোম সেক্রেটারি ক্রিস ফিলিপ এমপি কটাক্ষ করে বলেন, লেবার পার্টি দেশের হাই স্ট্রিটগুলোর যে ব্যাপক ক্ষতি করেছে, তা মাত্র কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দিয়ে ঠিক করা সম্ভব নয়। বর্তমানে অপরাধ ও অসামাজিক আচরণ অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে দাবি করে তিনি বলেন, টোরি সরকার ক্ষমতায় থাকলে রাস্তায় আরও বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন নিশ্চিত করত।
Leave a comment