ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় করে হাজার হাজার অভিবাসীকে যুক্তরাজ্যে পাচারের মূল হোতা কার্দো জাফ অবশেষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার আসল পরিচয় ও ছদ্মনামের গোমর ফাঁস হওয়ার পর ইরাকি কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থা তাকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কুর্দি নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে নিবিড় তদন্ত চলছে।
২৮ বছর বয়সী এই ইরাকি কুর্দি নাগরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘কার্দো রানিয়া’সহ বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করে আসছিলেন। নিজের আসল নাম কঠোরভাবে গোপন রাখায় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে বিবিসির সাংবাদিক স্যু মিচেল এবং রব লরি অক্লান্ত অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার আসল পরিচয় উন্মোচন করেন, যা রেডিও ৪-এর জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘ইনট্রিগ: টু ক্যাচ এ কিং’-এ বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
অবশ্য বিবিসির মুখোমুখি হয়ে জাফ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কোনো অপরাধ করেননি; বরং মানুষকে ইরাক ছাড়ার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কেবল সাধারণ পরামর্শ দিতেন।
গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, জাফ একটি শক্তিশালী কুর্দি মানব পাচারকারী চক্রের শীর্ষ হোতা, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অবৈধ অভিবাসীদের সিংহভাগ যাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত। ইরাকি কুর্দিস্তানের ‘রানিয়া’ শহরের নামানুসারে তিনি নিজের ছদ্মনাম নিয়েছিলেন, কারণ এই চক্রের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাই ওই অঞ্চলের বাসিন্দা। কুর্দি এমপি ডক্টর মুথানা নাদের বিবিসিকে জানান, এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। তার ধারণা, যুক্তরাজ্যে হওয়া মোট অবৈধ অভিবাসনের প্রায় ৭০ শতাংশই এই রানিয়া শহর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা যায়, জাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত রুটে মানব পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার বিজ্ঞাপনে লন্ডনের চাকচিক্যময় ছবি এবং তথাকথিত ‘সফল গ্রাহকদের’ ভুয়া প্রশংসাপত্র ব্যবহার করা হতো। অভিবাসীদের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি পরিবহনের বিভিন্ন ‘প্যাকেজ’ অফার করতেন। ছদ্মবেশী এক বিবিসি অনুবাদক গ্রাহক সেজে যোগাযোগ করলে জাফ ম্যানচেস্টারে একটি পুরো পরিবারকে বিমানে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘ভিআইপি’ রুটের খরচ বাবদ ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড দাবি করেন। অপরদিকে, কম সচ্ছল যাত্রীদের গভীর রাতে বিপজ্জনক ও ছোট নৌকায় করে উত্তাল ইংলিশ চ্যানেলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হতো।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) জানিয়েছে, গত ১৩ মে একজন শীর্ষ সন্দেহভাজন আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে তারা সরাসরি জাফের নাম উল্লেখ করেনি। এনসিএ-র অপারেশনস বিভাগের মহাপরিচালক রব জোন্স এই গ্রেপ্তারকে একটি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অপরাধীরা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, তারা আমাদের নাগালের বাইরে নয়।” তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় শীর্ষ স্তরের মানব পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমানে এনসিএ-র ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক তদন্ত চলমান রয়েছে।
Leave a comment