স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আগে ধারণা ছিল ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে মায়ের দুধের মাধ্যমে ইমিউনিটি থাকে। কিন্তু এখন সেই বয়সি শিশুরাও হাম আক্রান্ত হচ্ছে। এর বড় কারণ অপুষ্টি ও মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া। হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আমি দেখেছি অনেক মা নিজেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। ফলে শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিশু জন্মের পর শালদুধও পাচ্ছে না।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গুরোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে ১ ও উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত পরিস্থিতিবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
হামে মৃত্যুর হার কমে আসছে বলে দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, প্রথমবারের মতো শনিবার নিশ্চিত হাম রোগীর মৃত্যু শূন্য ছিল, আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে। তিনি বলেন, বেশির ভাগ রোগী হাম থেকে পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাম ভালো হওয়ার পরও সেকেন্ডারি ইনফেকশন ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালের পর দেশে নিয়মিত হাম টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে দেশে হামের টিকাও ছিল না। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জরুরিভিত্তিতে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় টিকা সংগ্রহ করা হয়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতি শনিবার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। মশা নিধনে স্প্রে কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে জোর না দিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তবে মাতৃদুগ্ধ পান, পুষ্টিকর খাবার, পরিচ্ছন্নতা, আইসোলেশন এবং সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হাম ও ডেঙ্গু দুই রোগই অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সেমিনারে হামের বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারহানা হক। ডেঙ্গু সচেতনতা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাবের গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ডা. মো. সায়েম।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪৩ জনের। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৭৬৭ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫ জনে। অন্যদিকে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮৪ জনে। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৫৯ জন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে গেছে এক হাজার ২৭৪ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৬৪ জন। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে এক হাজার ৯৯ জন।
হামে শিশু মৃত্যুর প্রতিবাদে প্রতীকী কফিন মিছিল : হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে রাজধানীতে প্রতীকী কফিন মিছিল হয়েছে। রোববার দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতার ব্যানারে একদল তরুণ অ্যাকটিভিস্ট, কবি, সাহিত্যিক ও পেশাজীবী মিছিলে অংশ নেন। তারা হামে মৃত শিশুদের গায়েবানা জানাজা পড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে মিছিল নিয়ে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মুখে রওয়ানা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়।
চমেক হাসপাতালে একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোববার দুপুর পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
চৌদ্দগ্রামে সাত মাসের শিশুর মৃত্যু : কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, চৌদ্দগ্রামে হামে সাজিদ আল নাহিয়ান নামে সাত মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের সিংরাইশ গ্রামের প্রবাসী পারভেজ আহমেদ সুমনের ছেলে। রোববার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
Leave a comment