বিশ্বরাজনীতি কখনোই নিষ্পাপ আদর্শের গল্প ছিল না। সভ্যতার মঞ্চে যতই গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং স্বাধীনতার উচ্চারণ শোনা যাক—ইতিহাসের অন্তরালে সবসময়ই চলেছে শক্তির নীরব প্রতিযোগিতা। সেখানে নীতির ভাষা থাকে সামনে, আর স্বার্থের হিসাব লেখা থাকে আড়ালে। বিশ শতকের ইতিহাস খুললেই এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেল শিল্প জাতীয়করণের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত ছিল কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়; তা ছিল বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থের কেন্দ্রে আঘাত। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সরকার ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে ইতিহাসের গবেষণা বারবার সেই প্রশ্ন তোলে—এটি কি শুধুই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল, নাকি বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসাবও সেখানে কাজ করেছিল?
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসেও যেন একই প্রতিধ্বনি। গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেন্স ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে বহুজাতিক করপোরেট প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ফলাফল—খুব দ্রুত তাঁর ক্ষমতার অবসান। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে যখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতির পুনর্গঠনের পথে হাঁটতে শুরু করলেন, তখন ১৯৭৩ সালের এক রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার অবসান ঘটায়।
আফ্রিকার স্বাধীনতার ইতিহাসও এমন অনেক অসমাপ্ত স্বপ্নে ভরা। কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা নিজের দেশের সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। স্বাধীনতার আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়ে পরিণত হন। ঘানার নেতা কোয়ামে নক্রুমা পশ্চিমা অর্থনৈতিক প্রভাবের বাইরে একটি স্বাধীন উন্নয়ন মডেলের কথা বলেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থান তাঁকে ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসও একই প্রশ্ন তুলে ধরে। ইরাকের নেতা সাদ্দাম হুসেইন কিংবা লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি—তাঁদের পতনের ব্যাখ্যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সেই ঘটনাগুলোর ভেতরে জড়িয়ে ছিল জ্বালানি সম্পদের হিসাব, আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াই এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ।
এসব উদাহরণ আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়—বিশ্বরাজনীতি কখনোই কেবল নীতির মঞ্চ নয়; এটি একই সঙ্গে স্বার্থের যুদ্ধক্ষেত্র।
আজকের পৃথিবীতেও সেই বাস্তবতা বদলায়নি। বরং নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব এখন বিশ্বশক্তিগুলোর নজরের কেন্দ্রে। সমুদ্রপথ, বন্দর, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এখন বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন দাবার ছকে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিকেও অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোয় দেখার আহ্বান জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর যে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে কেউ বলেন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা, কেউ বলেন অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অসন্তোষের কথা।
তবে আরেকটি প্রশ্নও ক্রমশ সামনে আসছে—বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক আগ্রহ কি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করছে না?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে বহু স্তরের কারণ—দেশের ভেতরের রাজনীতি, জনগণের প্রত্যাশা, অর্থনীতির টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির নীরব প্রতিযোগিতা।
তবু ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আদর্শের ভাষা যতই জোরালো হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে শক্তির ভারসাম্য।
এই কারণেই বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দেয়। গণতন্ত্রের ভাষা যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, শক্তির ছায়া কখনোই সেই ভাষার বাইরে থাকে না।
আর সেই ছায়ার ভেতরেই অনেক সময় নির্ধারিত হয়ে যায় একটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ—কখনো নিঃশব্দে, কখনো ইতিহাসের ঝড়ো অধ্যায়ে।
Leave a comment