বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নতুন এবং নজিরবিহীন শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইরান।
তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে কেবল তখনই, যখন তেলের লেনদেন চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ানে’ সম্পন্ন হবে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একাধিপত্য কমাতে একে ইরানের একটি বড় কৌশলগত চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইরান। এই পরিকল্পনারই একটি অংশ হলো ইউয়ানে লেনদেনের এই প্রস্তাব। যদিও এই দাবিটি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর যেভাবে রুবল বা ইউয়ানে তেল বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে, ইরানও এখন সেই একই পথে হাঁটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই নতুন সমীকরণ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের জুলাই মাসে তেলের দাম যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি বাণিজ্যের এই প্রধান পথটি অবরুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তেলের জোগান নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, এই জলপথে জাহাজ চলাচলে নতুন কোনো বিধিনিষেধ জারি হলে তা মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও ‘বিরাট প্রভাব’ ফেলবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে খাদ্য, ওষুধ ও সারের মতো জরুরি সামগ্রী সরবরাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে পরিবহন খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই পদক্ষেপ কেবল একটি বাণিজ্যিক শর্ত নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।একদিকে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ আর অন্যদিকে ডলারের বিকল্প মুদ্রা জনপ্রিয় করার এই লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Leave a comment