
কবি আবিদ কাওসার | ডিজিটাল যুগে ভূ-রাজনীতি আর কেবল কূটনীতিকদের গোপন বৈঠকের বিষয় নয়; এটি এখন ইউটিউব অ্যালগরিদমেরও আলোচিত পণ্য। বিশ্লেষণধর্মী চ্যানেল ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’ এর মাধ্যমে পরিচিত প্রফেসর চিয়াং সাম্প্রতিক সময়ে গেম থিওরির কাঠামো ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কয়েকটি বড় পূর্বাভাস দিয়েছেন। তাঁর ২০২৪ সালের তিনটি ভবিষ্যৎবাণী বিশেষভাবে আলোচিত—ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জিতবেন, তিনি ইরান এর সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন, এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেই যুদ্ধে পরাজিত হবে।
এই দাবিগুলো নিছক রাজনৈতিক মতামত নয়; এগুলো একটি বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশ। প্রফেসর চিয়াংয়ের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ‘ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ধারণা। তাঁর মতে, ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টির পথ বেছে নিতে পারে। এই কৌশলে প্রক্সি শক্তি—যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুথি মুভমেন্ট—ব্যবহার করে আঞ্চলিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখা হয়।
এ ধরনের সংঘাতে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি রুট, তেল অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত জ্বালানিনির্ভর। এই সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক বাজারে—ডলার, শেয়ারবাজার, এমনকি সাধারণ ভোক্তার পকেটেও।
প্রফেসরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি যুদ্ধের ব্যয়-কার্যকারিতা নিয়ে। একটি স্বল্পমূল্যের ড্রোন ধ্বংস করতে যদি বহু-মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা মিসাইল ব্যবহার করতে হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই থাকে না। আধুনিক অসম যুদ্ধের মূল শক্তি এখানেই—খরচের অসমতা। প্রশ্ন হলো, সামরিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব কি অর্থনৈতিক সহনশীলতার সীমাকে অতিক্রম করতে পারে?
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি—এমন ইঙ্গিত বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থল অভিযান মার্কিন জনমতের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয়। ইরাক ও আফগানিস্তান -এর অভিজ্ঞতা আমেরিকার সমাজ-রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে। ফলে যে কোনো প্রশাসনের জন্য যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিরও সমীকরণ।
প্রফেসর চিয়াং ট্রাম্পের সম্ভাব্য ব্যক্তিগত প্রেরণার কথাও উল্লেখ করেছেন—অহংকার, আর্থিক স্বার্থ, কিংবা জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের রাজনৈতিক হিসাব। তবে এ ধরনের দাবি প্রমাণনির্ভর না হলে তা বিশ্লেষণকে দুর্বল করে। আরও বিতর্কিত হলো তথাকথিত “গোপন গোষ্ঠী” বা ইলুমিনাতি -ধরনের শক্তির স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালিত হওয়ার ধারণা। এ ধরনের বক্তব্য প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের বদলে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
তাঁর চূড়ান্ত পূর্বাভাস—এই যুদ্ধ আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটাবে এবং বিশ্বকে মাল্টিপোলার কাঠামোর দিকে ঠেলে দেবে। বাস্তবে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ধীরে ধীরে বহুমেরুত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। চীন, রাশিয়া ও বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের উত্থান সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কোনো একক যুদ্ধ কি এই রূপান্তরের একমাত্র নির্ধারক হতে পারে, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও জনমিতিক পরিবর্তনের ফল?
ভূ-রাজনীতি কখনোই সরল সমীকরণ নয়। ভবিষ্যৎবাণী আকর্ষণীয়—কারণ তা অনিশ্চয়তার ভেতরে একধরনের বোধগম্যতা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা গড়ে ওঠে বহুস্তরীয় শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়ায়, যেখানে অর্থনীতি, জনমত, প্রযুক্তি ও কূটনীতি সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রফেসর চিয়াংয়ের বিশ্লেষণ আমাদের ভাবতে শেখায়—এটাই তার শক্তি। তবে সমালোচনামূলক দূরত্ব বজায় রাখাও জরুরি। কারণ তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ আর অনুমাননির্ভর কল্পনা এক নয়। আমাদের আহ্বান একটাই—যুদ্ধ ও রাজনীতিকে আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও যুক্তির আলোয় মূল্যায়ন করি।
প্রফেসর চিয়াং এর তিনটি ভবিষ্যৎ বাণী বিস্তারিত: https://bbm.news/তিন-ভবিষ্যদ্বাণীর-দুইটি/
প্রফেসর চিয়াং এর সাক্ষাৎকার: https://youtu.be/4Ql24Z8SIeE?si=p81vTdrlP4kRH8_J
Leave a comment