যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালে ইরানে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্মের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। রাজধানী তেহরানে রোববার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সমাবেশ, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন বিক্ষোভকারীরা।
বার্তা সংস্থা এএফপি এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহতদের স্মরণ এবং ঘটনার বিচার দাবিতে শনিবার তরুণদের একটি অংশ আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, তারা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন।
ইরানের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, তেহরানের অন্তত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা সাবেক শাহ মুহম্মদ রেজা শাহ পাহালভির আমলের পতাকা হাতে মিছিল করছেন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। কিছু স্লোগানে ইরানে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ক্ষমতাসীন সরকারের সমর্থকরাও পৃথক সমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। দেশটির মুদ্রা ইরানি রিয়াল বিশ্বে অন্যতম দুর্বল মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব—এসব ইস্যুতে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ব্যবসায়ী ও দোকান-মালিকরা প্রথমে আন্দোলন শুরু করেন।
পরবর্তীতে সেই আন্দোলন বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং ইরানে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দেন। তবে পরবর্তীতে তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়ান।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
ডিসেম্বর-জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) তাদের ওয়েবসাইটে দাবি করেছে, নিহতের সংখ্যা সাত হাজারেরও বেশি। আবার ইরানের বিভিন্ন সূত্র প্রায় ১৫ হাজার মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করেছে। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও পরমাণু আলোচনা—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে নতুন করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কতটা বিস্তৃত হবে এবং সরকার কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ—এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
Leave a comment