স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে সংঘটিত ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৯ জনে পৌঁছেছে। দ্রুতগতির দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশটির গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্ঘটনায় আরও বহু যাত্রী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়, রোববার (১৮ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় করদোবা অঞ্চলের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। মাদ্রিদের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি দ্রুতগতির ট্রেন বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি হাই-স্পিড ট্রেনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় দুই ট্রেনে মোট প্রায় ৪০০ জন যাত্রী ও রেলকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। সর্বশেষ সরকারি তথ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। আহতদের মধ্যে অন্তত ৪৮ জন এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে পাঁচজন শিশু ও ১১ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘর্ষের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দ্বিতীয় ট্রেনটির সামনের দিকের কয়েকটি বগি। সেখানে থাকা যাত্রীদের বড় একটি অংশই গুরুতর আহত হন বা প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর ট্রেনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জীবিতদের বের করে আনতে উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়েছে।
সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা, দমকল বাহিনী, চিকিৎসক দল এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, আহত যাত্রীদের স্ট্রেচারে করে ট্রেনের বগি থেকে বের করে আনা হচ্ছে এবং ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের মুহূর্তে একটি বিকট শব্দ শোনা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনের বগিগুলো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। অনেক যাত্রী হঠাৎ আঘাতে গুরুতর আহত হন, কেউ কেউ ট্রেনের ভেতর আটকে পড়েন।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী ওসকার পুয়েন্টে দুর্ঘটনার পর এক বিবৃতিতে জানান, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক একটি ঘটনা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
তদন্ত কমিটি ট্রেনগুলোর গতিবেগ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ট্র্যাকের অবস্থা এবং চালকদের ভূমিকা—সব দিক খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছে পরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি, মানবিক ভুল কিংবা সিগন্যাল ব্যবস্থার ব্যর্থতা—এই তিনটি সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এসেছে, তবে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা হয়নি।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ইউরোপীয় কমিশন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে কমিশন জানিয়েছে, তারা স্পেনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনে সব ধরনের কারিগরি ও মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেন, “ইউরোপের অন্যতম আধুনিক রেল নেটওয়ার্কে এমন দুর্ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা স্পেনের পাশে আছি এবং তদন্ত ও উদ্ধারকাজে সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”
Leave a comment