কলম্বিয়ার মধ্যাঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। আমাজনের গুয়াভিয়ারি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই সংঘর্ষ হয় বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ। কোকেন উৎপাদন ও পাচারের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এলাকাটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছে। খবর রয়টার্স।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) গুয়াভিয়ারি অঞ্চলের এল রেতোর্নো এলাকার একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে সংঘর্ষটি ঘটে। অঞ্চলটি রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে এটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষগুলোর একটি।
কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, সংঘর্ষের মূল কারণ ছিল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। বিবৃতিতে বলা হয়, গুয়াভিয়ারি অঞ্চল কোকেন উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পাচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডর। ফলে এই এলাকার দখল নেওয়া মানেই মাদক ব্যবসা থেকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন।
সামরিক কর্মকর্তারা জানান, সংঘর্ষে জড়ানো উভয় গোষ্ঠীই কলম্বিয়ার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী (ফার্ক) থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্রোহী সংগঠনের অংশ। ২০১৬ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করার পর এসব গোষ্ঠী আলাদাভাবে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, সংঘর্ষে জড়ানো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন কুখ্যাত বিদ্রোহী নেতা নেস্তর গ্রেগোরিও ভেরা, যিনি ‘ইভান মরদিস্কো’ নামে পরিচিত। অপর গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন আলেক্সান্দার দিয়াজ মেন্দোজা, যিনি ‘কালারকা কর্দোবা’ নামে পরিচিত।
এই দুই গোষ্ঠী আগে তথাকথিত ‘সেন্ট্রাল জেনারেল স্টাফ’ নামের একটি বৃহৎ বিদ্রোহী জোটের অংশ ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হয়ে যায়। এরপর থেকেই গুয়াভিয়ারি ও আশপাশের এলাকায় তাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সংঘর্ষে নিহত ২৭ জনের সবাই ইভান মরদিস্কোর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সদস্য। অন্যদিকে কালারকা কর্দোবার গোষ্ঠীর এক নেতা রয়টার্সকে ২৭ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুর্গম এলাকা হওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় সেনাবাহিনী অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করেছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে আলেক্সান্দার দিয়াজ মেন্দোজার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যুক্ত রয়েছে। পেত্রো সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘টোটাল পিস’ বা সর্বাত্মক শান্তি উদ্যোগের আওতায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে।
এর বিপরীতে ইভান মরদিস্কোর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি স্থগিত হওয়ার পরও বেসামরিক জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থান দেশটির শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সংঘর্ষে জড়িত উভয় গোষ্ঠীই ২০১৬ সালে কলম্বিয়া সরকার ও ফার্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১৩ হাজার ফার্ক যোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান।
তবে চুক্তি কার্যকরের পরও একটি অংশ অস্ত্র ত্যাগ না করে নতুন করে সংগঠিত হয়। মাদক পাচার ও অবৈধ খনি থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তারা সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলেই গুয়াভিয়ারির মতো অঞ্চলগুলোতে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
কলম্বিয়ায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মাদক পাচার, অবৈধ খনি ও সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সহিংসতা দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো পলাতক বিদ্রোহী নেতা ইভান মরদিস্কোকে কুখ্যাত মাদকসম্রাট পাবলো এস্কোবারের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “এই ধরনের নেতারা শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।”
Leave a comment