ভারতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি প্রস্তাব। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয়টি রাজ্য নিয়ে একটি পৃথক ও নিরাপদ খ্রিস্টান আবাসভূমি গঠনের আহ্বান জানিয়েছে খালিস্তানপন্থী সংগঠন শীখস ফর জাস্টিস (এসএফজে)। প্রস্তাবিত এই আবাসভূমির নাম ‘ট্রাম্প ল্যান্ড’ রাখার কথাও ঘোষণা করেছে সংগঠনটি, যা ইতোমধ্যে ভারতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বড়দিন উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টানদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠার পরপরই এসএফজের এই প্রস্তাব আসে। সংগঠনটির দাবি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে খ্রিস্টানরা ভারতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার মুখোমুখি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ও সুরক্ষিত আবাসভূমি গঠন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছে তারা।
সংগঠনটি তাদের প্রস্তাবের অংশ হিসেবে একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেছে। সেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা ও আসাম—এই ছয়টি রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এসএফজের যুক্তি অনুযায়ী, এই অঞ্চলগুলোতে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের ভিত্তিতে এখানেই একটি পৃথক খ্রিস্টান আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
একটি ভিডিও বার্তায় এসএফজের শীর্ষ নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বর্তমান পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ভারতে খ্রিস্টানরা কেবল ধর্মীয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পান্নুন এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বলেন, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
পান্নুন দাবি করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন বিশ্বনেতা, যিনি চাইলে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর ভাষায়, “এই সংকট মোকাবিলায় সাহস, ক্ষমতা ও প্রভাব—এই তিনটি গুণ একসঙ্গে ট্রাম্পের মধ্যেই রয়েছে।” তিনি বড়দিনকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা, উপাসনায় বাধা ও সংগঠিত নিপীড়নের অভিযোগ তুলে ধরেন।
এসএফজে নেতার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ভারতে শুধু খ্রিস্টান নয়, পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায়ও তীব্র নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, বাইবেল প্রচারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, গির্জায় অগ্নিসংযোগ, খ্রিস্টান বসতিতে হামলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা এবং মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনাকে তিনি একটি “সংগঠিত নিপীড়নের অংশ” হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও মন্তব্য করেছেন। উপাসনালয়ে হামলা, গির্জা ভাঙচুর, ধর্মান্তরের অভিযোগে হয়রানি এবং বড়দিন ও ইস্টারের মতো ধর্মীয় উৎসবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। যদিও ভারত সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রয়েছে বলে দাবি করছে।
এসএফজে নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন তাঁর বক্তব্যে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের একটি পুরোনো মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে ভারতকে একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার কথা বলা হয়েছিল। পান্নুনের মতে, এই ধরনের বক্তব্য ও আদর্শই ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সংকটকে আরও গভীর করছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন শীখস ফর জাস্টিস দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণভোট ও প্রচারণা চালিয়ে আসছে। ভারত সরকার সংগঠনটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে এসএফজের ‘ট্রাম্প ল্যান্ড’ প্রস্তাবও নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে একটি বিতর্কিত ও সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a comment