বাংলাদেশের অপরাধ মানচিত্রে এক ভয়াবহ অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত তিন মাসে সারাদেশে খুনের মহোৎসব এবং রাজধানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য তৎপরতা জননিরাপত্তাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) সারাদেশে মোট ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই প্রাণ হারিয়েছেন ১০৭ জন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারাদেশে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে সর্বোচ্চ ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগরীতে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ১৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছে। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও প্রযুক্তির সহায়তায় তারা ঢাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে। দুবাই, সুইডেন, থাইল্যান্ড ও ভারতে বসে তারা ‘রিমোট কন্ট্রোল’ পদ্ধতিতে চাঁদাবাজি ও কিলিং মিশন পরিচালনা করছে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা সরাসরি ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের হুমকি দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগীরা সরাসরি ভুক্তভোগীর কাছে গিয়ে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলছে, ‘বড় ভাই কথা বলবেন’। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই নেমে আসছে প্রাণনাশের হুমকি কিংবা সশরীরে হামলা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং পরবর্তী সময়ে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে। কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুর মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে আসার পর ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় পিচ্চি হেলাল ও ইমনের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত রক্তপাত ঘটছে। সম্প্রতি এলিফ্যান্ট রোডে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের ক্যাডারদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যেও উঠে এসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো কোন্দল।
রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও এবং মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ওয়াসা ভবন, তিতাস, খামারবাড়ি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো সরকারি দপ্তরগুলোর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক ও রবিনরা। কারওয়ান বাজারের আড়ত, সবজির ট্রাক এবং গ্রিন রোডের লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চাঁদার একটি বড় অংশ ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর অন্যান্য এলাকার তুলনায় মোহাম্মদপুর ও বেড়িবাঁধ এলাকা বর্তমানে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে ইমন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা এবং তার দুই দিন পর আসাদুল হক নামে আরেক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা আতঙ্কিত করে তুলেছে এলাকাবাসীকে। ১৮ বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হওয়া ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কিলার জসিম ও তার সহযোগী লেদু হাসানের নাম এখন এই এলাকার মানুষের মুখে মুখে।
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো পরিচয় নেই। যারাই অপরাধে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের গ্রেফতারে পুলিশের নানামুখী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। বিশেষ করে কাফরুলের একটি গার্মেন্টে ঢুকে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের গুলিবর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তোয়াক্কা করছে না। বিশেষজ্ঞমহল মনে করছেন, দ্রুত এই ‘গডফাদার’ এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের নির্মূল করা না গেলে অপরাধের এই গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
Leave a comment