দেশে আর কখনো যেন ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেজন্য সরকারি ও বিরোধী দলসহ দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমিক সকল কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধা একটি একক কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’।
বুধবার রাতে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেট সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা পেশ করেন। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের মৌলিক দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড কিংবা ধর্মীয় গুরুদের জন্য দেওয়া বিশেষ কার্ডের মতো সুবিধাগুলো জনগণের প্রতি কোনো করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই ভবিষ্যতে আলাদা আলাদা সকল কার্ডের সমন্বয়ে এই সর্বজনীন ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা একক পরিচয় ও কার্ডেই সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা লাভ করবেন।
অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিগত স্বৈরাচারী আমলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। এই কালো অধ্যায় থেকে দেশকে বের করে এনে ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বদলে একটি টেকসই বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এই মহাপরিকল্পনায় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ এবং ব্লু ইকোনমি ও ইকোটুরিজমসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে পর্যায়ক্রমে ৯ কোটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “জনগণের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত ৩১ দফা এখন জাতীয় দলিলে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি দফা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।” তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও আহতদের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে উঠতে আগামী ৫ বছরে এই দুই খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। কুইক রেন্টালের নামে বিগত আমলের বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে সক্রিয় করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পরিশেষে তিনি হিংসা, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সংসদে ন্যায়পরায়ণতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন এবং দেশের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
Leave a comment