মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার দেশটির ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ৬ হাজারের বেশি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়েছে, মানবিক ও করুণার ভিত্তিতে দেওয়া এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় মোট ৬,১৮৬ জন বন্দি মুক্তি পাবেন, যাদের মধ্যে ৬,১৩৪ জন মিয়ানমারের নাগরিক এবং ৫২ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি জানিয়েছে, এই ক্ষমার পাশাপাশি দেশজুড়ে অন্যান্য কারাবন্দীর সাজা এক-ষষ্ঠাংশ কমানো হবে। তবে হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি এবং অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা এই সুবিধার বাইরে থাকবেন।
তবে এই ঘোষণায় রাজনৈতিক বন্দীরা অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়নি কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটাই এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত দিক।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (AAPP)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে এখনো ২২ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের কর্মীরা।
এই সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা এমন এক সময় এলো, যখন মিয়ানমারে বহুল সমালোচিত সাধারণ নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম নির্বাচন, যার প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়।
তবে বিরোধী দল, জাতিসংঘ কিংবা পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না । তাদের অভিযোগ, জান্তা সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছে এবং নির্বাচনের সমালোচনাকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করেছে। ফলে ভোটগ্রহণ কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই মিয়ানমারে ব্যাপক অস্থিরতা চলছে। সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ মৌলিক মানবিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
অং সান সু চি বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। জান্তা সরকারের দেওয়া বিভিন্ন মামলার রায়ের মাধ্যমে তাকে কার্যত রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বন্দিমুক্তির এই ঘোষণা ও চলমান নির্বাচন—দুটিই সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা এবং নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার কৌশলের অংশ। তবে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া এসব পদক্ষেপ বাস্তব পরিবর্তন আনবে না বলেই মত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহল এখন নজর রাখছে—স্বাধীনতা দিবসের সাধারণ ক্ষমার তালিকায় রাজনৈতিক বন্দীদের নাম যুক্ত হয় কি না এবং মিয়ানমার সত্যিই কোনো রাজনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হয় কি না
Leave a comment