সিলেটের তিনটি বড় পাথর কোয়ারি—জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দিতে চলছে লাগামহীন পাথর লুট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে পুনরায় শুরু হওয়া এই লুটপাটে ইতোমধ্যেই প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার পাথর লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযানে ব্যর্থ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
২০০০ সালের দিকে পরিবেশবাদী সংস্থা ‘বেলার’ প্রধান নির্বাহী হিসেবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের আইনি লড়াইয়ের ফলে বন্ধ হয়েছিল অবৈধ পাথর উত্তোলন। তখন জাফলংসহ সিলেটের অন্যান্য কোয়ারিতে ফিরেছিল স্বস্তি। ২০১৪ সালে অবৈধ পাথর লুটে অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার পর তার অন্তহীন লড়াইয়ে প্রশাসন সক্রিয় হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় পাথর উত্তোলন। শ্রমিক মৃত্যুর মিছিল কমে আসে।
উচ্চ আদালতে বেলার রিটের কারণে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দশ বছরে সিলেটের কোয়ারি লুটপাট থেকে রক্ষা পায়। শেখ হাসিনা সরকারের শেষদিকে কানাইঘাটের লোভাছড়া কোয়ারি ইজারা দেয়া হলেও উত্তোলিত পাথর সরিয়ে নিতে পারেনি পাথরখেকোরা।
পাথর লুট বন্ধ হওয়ায় সিলেটের কোয়ারিগুলোতে যৌবন ফিরে এসেছিল। পাথরে পাথরে ভরে গিয়েছিল পর্যটনস্পট জাফলং, বিছনাকান্দি ও সাদাপাথর সহ কয়েকটি পর্যটন স্পট। কিন্তু ৫ই আগষ্টের পর আর সেই পাথর গুলো রক্ষা করা যায়নি। লিজ না নিয়েই তিনটি পাথর কোয়ারি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়েছে।
কয়েকশ’ বোমা মেশিন প্রতিদিন জাফলংয়ের ভূগর্ভ থেকে পাথর লুট করছে। । প্রথম দিকে কেবল মাটির ওপরের পাথর সরানো হলেও এখন চলছে গভীর খনন। মাত্র ১০ দিনের অভিযানে ১২৫ কোটি টাকার পাথর লুটের প্রমাণ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয়দের মতে, গত ৭ মাসে জাফলংয়ে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি পাথর চুরি হয়েছে।
ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে গত ৭ মাসে আড়াই হাজার কোটি টাকার পাথর লোপাট হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শারপিন টিলা সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে অন্তত ২০০ কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে,এই টিলা থেকে উত্তোলিত পাথরে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে বিতর্কিত হন কোম্পানীগঞ্জ থানার সাব-ইন্সপেক্টর সহ ১৩ পুলিশ সদস্য। বিছনাকান্দি কোয়ারিতে গত দুই মাসেই লোপাট হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার পাথর। এই কোয়ারির লুটের পাথর জব্দ করতে গিয়ে গোয়াইনঘাটের পুলিশও বিতর্কিত হয়।
পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি বহুমুখী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম শাহ্পরাণ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন এবং যুবদলের রজন আহমদ, রুবেল আহমদ বাহার ও মোস্তাকিম ফরহাদ। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও ব্যবসায়ীদের একাংশও জড়িত রয়েছে এই লুটপাটে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা ও অভিযান চালানো হলেও তা কার্যত কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মোট ৩০-৩৫টি মামলা ও শতাধিক আসামির তালিকা থাকা সত্ত্বেও লুটপাট অব্যাহত। সহকারী পরিচালক মো. বদরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে এবং যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাফলং থেকে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত অঞ্চলটি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভূগর্ভ খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের কারণে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের আশঙ্কা আরও তীব্র হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা কিংবা অংশগ্রহণ ছাড়া এত বড় আকারে পাথর লুট সম্ভব নয়। “সবাই জানে, কিন্তু কেউ কিছু করে না,”—বলেছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা।
এই পাথর লুট কেবল একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এ অবস্থায় প্রয়োজন সেনাবাহিনীসহ একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী যৌথ বাহিনীর হস্তক্ষেপ, যাতে প্রকৃতি ও দেশের সম্পদ রক্ষা পায়।
Leave a comment