জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায় উন্মুক্ত করা হয়। এতে উঠে এসেছে, কীভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আন্দোলন দমনে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড এবং নিপীড়নের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে গত ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল–১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। একই সঙ্গে তাদের বাংলাদেশে অবস্থিত সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি প্রধান অপরাধে মোট ছয়টি সুনির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে।
এতে তিনটি ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য, ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ আহ্বান, এই উসকানি ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় রংপুরে আন্দোলনকারী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা
এই তিন ঘটনার জন্য শেখ হাসিনা ও কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এখানে আরও ভয়াবহ তিনটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। রায়ে বলা হয়, ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপস ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ফোনালাপে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণের নির্দেশ দেন।
এর ফল হিসেবে—৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুলে ছয় আন্দোলনকারী নিহত হন, একই দিন সাভারের আশুলিয়ায় আরও ছয়জনকে হত্যা করে তাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়
এই নৃশংসতার জন্য আদালত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেসামরিক জনগণের ওপর পরিকল্পিত ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট উদাহরণ।
ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, এই বিচার কেবল ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দমননীতির বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের এক ঐতিহাসিক নজির।
Leave a comment